১৯৯৪ বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদটা ছিলো ব্রাজিলের কাছে অন্যরকম। ২৪ বছর পর রাজমুকুট ফিরে পাওয়ার আনন্দ কেমন হবে তা বোঝারই কথা। সেই ধারা বজায় রাখতেই ১৯৯৮ বিশ্বকাপ খেলতে ফ্রান্সে পা রাখে ব্রাজিল দল। রোনালদো,রিভালদো,বেবেতো,দুংগা,রবার্তো কারলোস,কাফু,লিওনার্দো দের নিয়ে গড়া ব্রাজিল দল। অদম্যই বলা যায়। তার ওপর গত বিশ্বকাপে আলো ছড়ানো বেবেতো এবারো আলো ছড়ানোর অপেক্ষায়। রোনালদো তখন টগবগে ঘোড়ার মতো,সদ্য দুবার ফিফা বর্ষসেরা প্লেয়ার নির্বাচিত হয়েছে। রাজমুকুট নিজেদের ঘরের রেখে দেওয়ার পথে প্রথম ধাপে গ্রুপসঙ্গী হিসেবে পেলো নরওয়ে,মরক্কো ও স্কটিশ দের। প্রথম বাধা স্কটল্যান্ড। ১০ জুন,১৯৯৮ সাল। সিজার সাম্পাইওর গোল এবং একটি ওন গোলের সাহায্যে ২-১ গোলের ব্যবধানে ম্যাচ জিতে নেয় ব্রাজিল। পরের ম্যাচ আফ্রিকান টিম,মরোক্কোর সাথে। ৬ দিন পর। ৩-০ গোলের সহজ জয়ই পায়। রোনালদো,রিভালদো ও বেবেতো ত্রয়ীর তিন গোলে শিরোপার পথে আরেক ধাপ এগিয়ে যায় ব্রাজিল। কিন্তু বাধাটা আসে পরের ম্যাচে। ২৩ জুনের সেই ম্যাচে নরওয়ের সাথে ১-২ গোলে হেরে যায় ব্রাজিল। ৭৮ মিনিটে বেবেতোর গোলের পরও ৮৩ ও ৮৯ মিনিটে দুই গোল হজম করে ম্যাচ হারতে হয়। সে ম্যাচ এ পর পর দুটি হলুদ কার্ডের কারণে ম্যাচে ছিলো না ব্রাজিলিয়ান মিডফিল্ডার সিজার সাম্পাইও। এটি অনেক বড় প্রভাব ফেলে। কিন্তু তাতে কোনো সমস্যা হয়নি। ব্রাজিল গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়েই নক আউট পর্বে পা বাড়ায়। ২৭ জুন,১৯৯৮। নক আউট পর্ব বা রাউন্ড অফ সিক্সটিন এ ব্রাজিল মুখোমুখি হয় চিলির। ৪-১ গোলে এক প্রকার উড়িয়েই দেয় ব্রাজল চিলিকে। আগের ম্যাচ মিস করা সিজার সাম্পাইও ও রোনালদো দুটি করে গোল করে। দারুণ ছন্দে থাকা ব্রাজিল কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি হয় ডেনমার্কের। ম্যাচের ২ মিনিটের মাঝেই গোল খেয়ে বসে ব্রাজিল। অবশ্য কাম ব্যাক করতে সময় নেয়নি। ১০ মিনিট ও ২৫ মিনিটে বেবেতো ও রিভালদোর দুই গোলে এগিয়ে যায় ব্রাজিল। তারপর ৫০’ মিনিটে লড্র‍্যাপ এর গোলে ডেনমার্ক সমতা আনলেও ৫৯ মিনিটে বেবেতোর গোল আবার এগিয়ে দেয় ব্রাজিলকে। শেষ বাঁশি বাজার আগ পর্যন্ত আর স্কোরের পরিবর্তন হয়নি। কিন্তু ৮১তম মিনিট ও আগের ম্যাচের শেষমুহুর্তে হলুদ কার্ড দেখায় পরের ম্যাচের নিষেধাজ্ঞায় পড়ে যায় কাফু। প্রথম সেমিফাইনালে ব্রাজিলের প্রতিপক্ষ ডাচ রা। নেদারল্যান্ডস এর বিপক্ষে ম্যাচটা এতটা সহজ ছিলো না। তার ওপর দলে নেই বিশ্বস্ত রক্ষী কাফু। তারপরও ৪৬ মিনিটে রোনালদোর গোলে এগিয়ে যায় ব্রাজিল। ম্যাচের অন্তিম মুহুর্ত পর্যন্ত স্কোর ১-০ ই ছিলো। এক পর্যায়ে মনে হচ্ছিলো ১ গোলের ব্যবধানেই ফাইনালে চলে যাবে ব্রাজিল। কিন্তু নাহ। ৮৭ মিনিটে ক্লুইভার্ট গোল পরিশোধ করে খেলায় উত্তেজনা বাড়িয়ে দেয়। তারপর অতিরিক্ত সময়েও স্কোরলাইন এর পরিবর্তন না হলে খেলা গড়ায় পেনাল্টি শ্যুট আউটে। সেখানে ডাচরা ৪-২ গোলে পরাজিত হলে ফাইনালে পৌঁছে যায় ব্রাজিল। তাদের সামনে তখন পেন্টা জয়ের হাতছানি। কে হবে স্বপ্নের পেন্টা জয়ে তাদের সামনে বাধা??? স্বাগতিক ফ্রান্স নাকি ক্রোয়েশিয়া?? তা জানার জন্য আরেকদিন অপেক্ষা করতে হবে। ৮ জুলাই,দ্বিতীয় সেমিফাইনাল এর ফলাফল জানা পর্যন্ত। ১২ই জুলাই,১৯৯৮। ব্রাজিল বনাম ফ্রান্স। এক দলের লক্ষ্য পঞ্চমবারের মতো শিরোপা ঘরে তোলা আরেক দল প্রথম বারের মতো নিজেদের গায়ে বিশ্বজয়ের তকমা লাগানোর প্রচেষ্টায় মুখোমুখি। এক দিকে রোনালদো-রিভালদো-বেবেতো-দুংগা-কার্লোস-কাফু অপরদিকে জিদান-দেশম-থুরামেরা। পরিস্কারভাবেই ফেভারিটের তকমা লাগিয়ে এসেছে ব্রাজিল,সেই তুলনায় ফ্রান্স কিছুটা পিছিয়ে। আবার ফ্রান্স নিজ মাটিতে খেলছে,তাই কিছুটা সুবিধা অবশ্যই পাবে। এদিকে ফ্রান্সের প্রাণভোমরা জিদান তখনও পর্যন্ত পুরো টুর্নামেন্ট এ তেমন আহামরি কিছু করতে পারেনি। কিন্তু ব্রাজিলে দলগত প্রচেষ্টায় নিজ স্বরূপে ফাইনালে উপস্থিত হয়েছে। সেইন্ট ডেনিসে সেদিন তাই বেশিরভাগেরই মনে হয়েছিলো ব্রাজিলই পাচ্ছে শিরোপা। কিন্তু কিক অফ এর পর দৃশ্যটা কেমন হয়েছিলো সেটিই জানার বিষয়। সেন্টারের ৩০ সেকেন্ডের ভেতরই স্টিফেন্ গিভার্শ স্কোরশিটে নাম লিখানোর দারুণ সুযোগ পায়,কিন্তু জুনিয়র বাইয়ানোর দৃঢ়তায় তা গোল এর বদলে গোল কিকে রূপ নেয়। ৪ মিনিটে আবারো গিভার্শ দুর্দান্ত গতিতে বল নিয়ে গোলমুখে এগিয়ে যায়,এবারো বাইয়ানো বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ফলে আর তা গোলে রূপ নিতে পারে নি। ৭ম মিনিটে বিপদজনক জায়গায় ফ্রি কিক পায় ফ্রান্স। জিদানের ফ্রি কিক নিতে আসে জিদান,তার ইন্ডিরেক্ট ফ্রি কিক থেকে বলে মাথা ছোঁয়ায় জোকায়েভ।কিন্তু তা গোলবারের উপর দিয়ে চলে যায়। ফ্রান্স আধিপত্য বিস্তার করে খেলতে থাকে। প্রথম ২০ মিনিটে ব্রাজিল বলার মতো কোনো সুযোগই সৃষ্টি করতে পারেনি। ২৩ তম মিনিটে কর্ণার প্রায় ব্রাজিল,কিন্তু আলদায়েরের হেড সহজেই মুঠোবন্দী করে ফেলে ফ্রেঞ্চ গোলকিপার ফ্যাবিয়ান বার্ঠেজ। ২৭ তম মিনিটে বাম দিক থেকে কর্ণার প্রায় ফ্রান্স।এমেনুয়েল পেটিটের কর্ণার থেকে দুর্দান্ত হেডে গোল করে ফ্রান্স কে এগিয়ে দেয় ফ্রান্সের প্রাণভোমরা জিনেদিন জিদান। টুর্নামেন্ট এর প্রথম গোলটি করার জন্য ব্রাজিলকেই বেছে নেয় সে। ৩১ মিনিটে রোনালদো দারুণ সু্যোগ পায়। কিন্তু ফ্রেঞ্চ গোলকিপার বার্ঠেজ এর বাজে চ্যালেঞ্জে রোনালদো সুযোগ কাজে লাগাতে পারেনি। তার কয়েক মিনিট পরই জোকায়েভ দারুণ ড্রিবলিং করে ব্রাজিলের রক্ষণ ভেদ করে বল নিয়ে ডি বক্সের বাইরে থেকে শট নেয়।কিন্তু তার দুর্বল শট সরাসরি গিয়ে পড়ে ব্রাজিল গোলকিপার ক্লদিও টাফারেল এর হাতে। ৪১ মিনিটে এমেনুয়েল পেটিট এর জোড়ালো শট জুনিওর বাইয়ানোর শরীরে লেগে দিক হারায়। ফে ব্যবধান দ্বিগুণ করার দারুণ সুযোগ হারায় ফ্রান্স। সবচেয়ে সহজ সুযোগটা ফ্রান্স পায় ফ্রান্স ৪৫ মিনিটে। গোলকিপারকে একা পেয়েও ফ্রেঞ্চ নাম্বার নাইন গিভার্শ বল মারে সরাসরি ব্রাজিলিয়ান গোলকিপার বরাবর। ফলে কর্ণার পায় ফ্রান্স। প্রথমার্ধের শেষ মুহূর্তে ডান দিক থেকে কর্ণার নিতে আসে জোকায়েভ। এবং আবারো পুরোনো ঘটনার পুনারবৃত্তি। জিনেদিন জিদান এর আরেকটি জোড়ালো হেড ও প্রথমার্ধেই ব্রাজিলের গায়ে দ্বিতীয় পেরেক ঠোকা। প্রথমার্ধের শেষ মুহূর্তে ব্রাজিল ফ্রি কিক পেলেও রবার্তো কার্লোস ব্যর্থ হয় স্কোরশিটে নাম লেখাতে। ২-০ ব্যবধান নিয়েই প্রথমার্ধ শেষ হয়। যার পুরোটাই ছিলো ফ্রান্সের আধিপত্যময়। বরং বলা যেতে পারে জিদান ময়। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই ব্রাজিল আধিপত্য বিস্তার করতে থাকে। ৪৭ ও ৫১ মিনিটে দুটি কর্ণারও পায়। ৫২ তম মিনিটে ব্রাজিলের পেনাল্টির আবেদন নাকচ করে দেয় আরব রেফারি আল জায়েদ। ৫৬তম মিনিটে ফ্রান্স সীমানায় ফ্রিকিক পায় ব্রাজিল। ফ্রিকিক থেকে রবার্তো কার্লোস এর ক্রসে বল গিয়ে পড়ে রোনালদোর পায়ে,সেখান থেকে দুর্দান্ত শট নেয় নাম্বার নাইন। কিন্তু ফ্রেঞ্চ গোলকিপারের দুর্দান্ত সেইভে তা গোলে পরিণত হতে পারেনি। ৫৯ তম মিনিটে আবারো ফ্রিকিক পায় ব্রাজিল। কিন্তু এবারো রবার্তো কার্লোস এর শট ফ্রেঞ্চ দেয়ালে লেগে ফিরে আসে। ৬০তম মিনিটে বেবেতোর জোড়ালো শট দারুণ ভাবে ব্লক করে ফ্রেঞ্চ সেন্টার ব্যাক মার্সেল ডেসায়লি। ৬৩ মিনিটে ফ্রাংক লেবাফের লং পাস থেকে বল পায় গিভার্শ। কিন্তু আবারো ফ্রেঞ্চ নাম্বার নাইন বল জালে জড়াতে ব্যর্থ হয়। ব্রাজিলিয়ান এটাক চলতেই থাকে। কিন্তু কাজ হচ্ছিল না। ৬৭ মিনিটে ডেসায়লি কাফুকে বাজেভাবে ট্যাকল করে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে মাঠছাড়া হয়। ফলে ১০ জনের দলে পরিণত হয় ফ্রান্স। ৭০তম মিনিটে আবারো সুযোগ পায় ব্রাজিল। কিন্তু ডেনিয়েলসন এর শট অনেক ওপর দিয়ে চলে যায়। ৮৩ তম মিনিটে জিদানের বাড়ানো বল থেকে ক্রিস্টোফার ডাগ্রে ক্লদিও টাফারেল কে সম্পূর্ণ একা পেয়েও গোলপোস্টের বাইরে বল পাঠিয়ে দেয়। আক্রমণ পালটা আক্রমণ চলতেই থাকে। কিন্তু কোনো দলই আর স্কোরশিটে নাম লিখাতে পারছিলো না। ৯১ তম মিনিটে ডেনিয়েলসন এর শট পোস্টে লেগে ফিরে এলে ব্রাজিলের হতাশার মাঝে আরেকটু প্রলেপ লাগিয়ে দিয়েছিলো। ৯২ মিনিটে কর্ণার প্রায় ব্রাজিল।কর্ণার থেকে দারুণ কাউন্টার এটাকে যায় ফ্রান্স।প্যাট্রিক ভিয়েরার বাড়ানো বল থেকে দারুণ শটে গোল করে ব্রাজিলের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেয় পেটিট। শেষ বাঁশি বাজার আগে আর স্কোরবোর্ডে আর কোনো পরিবর্তন আসেনি। সেদিন বিশ্বকাপ অর্জনকারীদের তালিকায় নাম লিখিয়েছিলো ফ্রান্স। আর ব্রাজিলের পেন্টাজয়ের অপেক্ষাকে করেছিলো আরও দীর্ঘ। মূলত ফাইনাল ম্যাচে এসেই ব্রাজিলকে আর চিরচেনা ব্রাজিল রূপে পাওয়া যায়নি।সেদিন বিশ্বসেরা ডিফেন্সের অবস্থা ছিল যাচ্ছেতাই। মাঝমাঠে তো শুধুমাত্র জিদান ছাড়া কাউকেই দেখা যায়নি। আর ফরোয়ার্ড ছিলো নিষ্প্রভ। ফলে স্বর্ণমুকুট হয়েছিলো হাতছাড়া।