Sunday, 24 Jun 2018

আমাদের ফুটবল এবং কিছু কথা

অস্ট্রেলিয়ার চেয়ে একশো নয় পিছিয়ে বাংলাদেশ। ৬১ আর ১৭০। কিন্তু মাঠের বাইরে?

এটা আপাতত থাক। গত অলিম্পিকে স্প্রিন্টের প্রি হিটে বাংলাদেশের সেরা স্প্রিন্টার মাহফুজ ভাই দৌড় শুরুর আগে উসাইন বোল্ট বা এমন বিখ্যাত কার সাথে যেন সাক্ষাত করেছিলেন। মাহফুজ ভাইকে দেখে তিনি খুবই অবাক হয়েছিলেন যে এত ছোটখাট মানুষটা স্প্রিন্টার কিভাবে!

বছরখানেক আগে মাশরাফী ভাই হাবিবুল বাশার ভাইয়ের নেতৃত্বকালীন সময়ে খেলার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেছিলেন যে এখন প্রায় খেলোয়াড়ের বাড়িতেই ব্যক্তিগত জিমনেশিয়াম আছে যেটা ওনারা তখন কল্পনাও করতে পারতেন না। দলের প্র্যাকটিস ক্যাম্প ছাড়া অন্য সময়ে চাইলেই মিরপুরে নিজের মত প্র্যাকটিস বা জিম করতে পারাটাও কষ্ট ছিল তখন।

ডেভ হোয়াটমোরের আমলে একবার পাকিস্তানের সাথে ম্যাচ খুব ক্লোজ করেও হেরে যাওয়ার পর কেউ হয়ত খেলোয়াড়দের কমিটমেন্ট নিয়েও একটু প্রশ্ন তুলেছিল। তখন একজন প্রখ্যাত ক্রীড়া সাংবাদিক বলেছিলেন, যে অবকাঠামোগত সুবিধা নিয়ে বাংলাদেশ দল খেলে সেটার সাথে পাকিস্তান দলের অবকাঠামোগত অবস্থার তুলনা করলে ম্যাচ যে এতটুকু ক্লোজ হয়েছে এটাই বড় কৌতুক মনে হয়!

ক্রিকেটারদের ভাল সময়ে এগুলো এখন রূপকথার মত মনে হয়। কিন্তু ফুটবলে? অন্যান্য খেলায়? এগুলো নির্মম বাস্তব।

বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লীগের দলগুলোর খেলোয়াড়েরা ম্যাচ খেলতে কিভাবে মাঠে যায়? তাদের ক্যাম্পগুলোতে থাকার ব্যবস্থা কি? তাদের পাওনা টাকা কতদিন পরপর পরিশোধ করা হয়? জাতীয় দলেই বা কতটুকু সুযোগ সুবিধা পাচ্ছে খেলোয়াড়েরা? তাদের জন্য সুনির্দিষ্ট কোন পরিকল্পনা আছে কি? কোচেরই বা স্বাধীনতা ও সুযোগ সুবিধা কতটুকু? এসব প্রশ্নের আসল উত্তর পেলে বাংলাদেশ যে অস্ট্রেলিয়ার দলের সাথে খেলতে মাঠে নামবে এটাও একটা মাচ ফানি জোক মনে হতে বাধ্য!

স্কোরিং ও ফিনিশিং দক্ষতার অভাবের কারণে এমিলি ভাইয়ের উপর সবারই মেযাজ খারাপ হয়। লর্ড বলতে ও গালিগালাজ করতে ছাড়ে এমন মানুষ কমই আছে। কিন্তু এই লোকটা কতটুকু ফ্যাসিলিটি পায় বা তার প্র্যাকটিসের ব্যবস্থা কি তা কয়জনেই বা খোঁজ নেয়?

এরচেয়েও কম সুযোগ সুবিধা নিয়ে ভালো খেলছে এমন প্লেয়ার নেই তা না। কিন্তু কতজন আছে এমন? প্রতিভার তারতম্য একটা পার্থক্য তো করেই দেয়। এছাড়া আফ্রিকান খেলোয়াড়েরা নিজেদের প্রাকৃতিক শারীরিক গঠনের কারণেই খেলার জন্য একটু বেশী সুবিধা পায়। এগুলো বাদ দিলে বাকি অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও পরিকল্পিত ভাবে গড়ে তোলার কোন বিকল্প কি আছে? ল্যাটিন দলগুলোই তো প্রতিভার খনি হওয়া সত্ত্বেও ইউরোপিয়ান দলগুলো থেকে ধীরে ধীরে পিছিয়ে পড়ছে ধরে নেয়া হচ্ছে এই অবকাঠামোগত উন্নয়নের পার্থক্যের কারণে!

খরচ করার জন্য টাকা তো লাগবে। এই টাকাটা কোত্থেকে আসবে? এই প্রশ্ন খালি এখনই উঠে। আর্জেন্টিনা ও নাইজেরিয়া দল যখন বাংলাদেশে ঘুরে গেল বা ম্যানইউ বার্সা পর্তুগালকে আনার কথা হয় তখন এই প্রশ্ন কেউ কেউ করলেও সবাই জানে যে উত্তর সহজই। গ্ল্যামারের জোরে টাকার ব্যবস্থা হওয়া ওয়ান টুর ব্যপার! কিন্তু এই গ্ল্যামার যে তৈরি করতে হয় সেটা কে হিসাব করে!

ইতিহাসের অন্যতম বড় ম্যাচের সামনে দাঁড়িয়ে এইসব প্রশ্ন তোলার সময় না। এখন আশায় বুক বাঁধার সময়। খড়কুটো থেকেও অনুপ্রেরণা খোঁজার সময়। এসব জানা আছে আমারও। তারপরও কোচ ও বাফুফের দ্বন্দ নিয়ে যা যা হল তা দেখে এইসব পুরনো কাঁসুন্দি না ঘেঁটে পারলাম না। এইসব দেখতে দেখতে ক্লান্ত।

কারো কারো মনে হতে পারে বেতন নিয়ে সমস্যা তো অস্ট্রেলিয়া দলেও চলছে, তারা তাহলে আমাদের চেয়ে এগিয়ে কি করে! বিষয়টা খেয়াল করার মতই। কিন্তু দেখার মত বিষয় হল ওখানে তারা দাবিটা তুলেছে পেশাদার ফুটবলারদের সংগঠনের মাধ্যমে! এবং সেই সংগঠন এতই শক্তিশালী যে তারা ঘোষনা দিয়েছে যে সমাধান হওয়ার আগ পর্যন্ত তারা ম্যাচ খেলা ছাড়া বোর্ডের আর কোন বানিজ্যিক কর্মকান্ডে অংশ নেবেনা! পার্থক্যটা আর বলা লাগবে কি?

বাংলাদেশ দল মাঠে নামবে এসব প্রশ্নের কোন উত্তর ছাড়াই। সব সময় এভাবেই খেলে আসছে। তবুও এটা কোন রসিকতায় পরিণত হয়নি এখনো, কারণ টাইগারেরা পেশাদারিত্বের সাথে আবেগ দিয়েও খেলে। নিজেদের দক্ষতার অভাব দূর করার চেষ্টা করে অন্তর দিয়ে খেলে, আমাদের কথা ভেবেই। আমরা চেঁচাই, আনন্দিত হই, গালিগালাজ করি ওই ভালবাসা থেকেই। ওই অন্তরটুকুর কথা ভেবেই।

আর স্বপ্ন দেখি এই প্রশ্নগুলোর সন্তোষজনক উত্তর পাওয়ার দিন আর বেশী দূরে নেই।

আরো পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *