Saturday, 21 Apr 2018

ইতিহাস গড়েই ইউরোপিয়ান সাম্রাজ্য রিয়াল মাদ্রিদের

জুন ৩, ২০১৭ সাল।
আর দশটা সাধারন দিনের মতো হলেও ফুটবল প্রেমীদের কাছে দিনটির মহাত্ম ছিল অন্যরকম। এইদিনেই যে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে মৌসুমের শেষ ম্যাচ। ইউরোপের মুকুট কার মাথায় যাচ্ছে তা নির্ধারনী ম্যাচ।

বাংলাদেশ সময় রাত ১২:৪৫। কার্ডিফের মিলেনিয়াম স্টেডিয়াম। ইউরোপের রাজত্ব নির্ধারনী মঞ্চে মুখোমুখি রিয়াল মাদ্রিদ এবং জুভেন্টাস।
মাদ্রিদের দ্বাদশ নাকি জুভের তৃতীয়? রোনালদোর চতুর্থ নাকি বুফনের প্রথম? গত কিছুদিন ধরে এইসব জল্পনা কল্পনা চলছিল ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে। এসব প্রশ্নের মিমাংসা হতে যাওয়া ফাইনালের মহারণ শুরু হলো জুভেন্টাসের কিক অফের মাধ্যমে।

খেলার শুরু থেকেই রিয়ালের উপর ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করে একের পর এক আক্রমণ করতে থাকে হিগুয়েন, ডাইবালা, মান্দজুকিচরা। খেলার ৩ মিনিটের মাথায়ই জুভেন্টাসের প্রথম আক্রমণ। মাঠের বামদিক থেকে মান্দজুকিচের ক্রসে মাথা ছোয়ান হিগুয়েন। কিন্তু কোন বিপদ ঘটার আগেই বল নিজের নিয়ন্ত্রণে নেন রিয়াল গোলরক্ষক কেইলর নাভাস। এরপরই হিগুয়েনের আরো একটি শট এবং বক্সের বাইরে থেকে পিয়ানিচের জোড়ালো শট দুর্দান্ত দক্ষতায় রক্ষা করেন নাভাস। এভাবে প্রথম ১৫ মিনিট একের পর এক আক্রমণ করে রিয়ালকে নিজের অর্ধে কোনঠাসা করে রেখেছিল জুভেন্টাস। এইসময়টা রিয়ালের খেলাও ছিল অগোছালো, এলোমেলো। কিন্তু তারা তো রিয়াল মাদ্রিদ, এই প্রতিযোগিতার সর্বকালের সেরা দল। তাদের এভাবে খেললে চলে না! তাই মুহুর্তের মধ্যে গা ঝাড়া দিয়ে উঠলো পুরো দল। খেলার তখন ২০ মিনিট। জুভেন্টাসের এমনই একটি আক্রমন থেকে বল উদ্ধার করে মুহুর্তের মধ্যেই পাল্টা আক্রমণে যায় রিয়াল। ক্রুস, ইস্কো, রোনালদোর পাঁ হয়ে আসা বল যায় মাঠের ডান প্রান্তে কার্ভাহালের কাছে। সেখান থেকে ডিবক্সের মাঝখানে থাকা রোনালদোর উদ্দেশ্যে কার্ভাহালের ডিফেন্স চেরা পাস এবং চলন্ত বলে রোনালদোর শট জুভেন্টাস ডিফেন্ডার চিয়েল্লিনির পায়ে লেগে হালকা দিকবদল করে গোলরক্ষক বুফনকে ফাঁকি দিয়ে জুভেন্টাসের জালে। ২০ মিনিটে প্রথম গোল দিয়ে এগিয়ে যায় রিয়াল মাদ্রিদ।

এক গোল খেয়েই নিজেদের আক্রমণে আরো ধার বাড়াতে থাকে তুরিনের বুড়িরা। ম্যাচের তখন ২৭ মিনিট। হাফ লাইনের সামান্য উপর থেকে মাঠের বাম প্রান্তে এলেক্স সান্দ্রোর উদ্দেশ্যে বনুচ্চির আঁড়াআঁড়ি পাস , সেখান থেকে হিগুয়েনের পাঁ ঘুরে বল মান্দজুকিচের কাছে। বুক দিয়ে রিসিভ করে ডিবক্সের বাম প্রান্ত থেকে মান্দজুকিচের অসাধারন এবং নিখুঁত বাইসাইকেল কিক কেইলর নাভাসকে ফাকি দিয়ে রিয়ালের জালে। ২৭ মিনিট শেষে স্কোরলাইনে দুইদলের ১-১ এ সমতা।
এরপর দুই দলই কিছুটা ছন্নছাড়া হয়ে খেলতে থাকে। জুভেন্টাস বারবার আক্রমণ করে গেলেও সঠিক পরিকল্পনার অভাবে গোলে পরিণত হচ্ছিল না একটাও। এর মধ্যেদিয়েই আর কোন উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটার আগেই প্রথমার্ধের বাঁশি বাজে।

বিরতির পর দুই দলই চাঙ্গা হয়ে মাঠে নামে। কিন্তু এই অর্ধে খেলার শুরু থেকেই মধ্যমাঠের নিয়ন্ত্রণ নেয় ক্রুস-ক্যাসেমিরো-মড্রিচ নিয়ে গঠিত রিয়ালের মিডফিল্ডার ত্রয়ী। প্রথমার্ধের বিপরীত ধারাতেই শুরু হয় দ্বিতীয়ার্ধ। এবার শুরু থেকে আক্রমণ করতে থাকে রিয়াল মাদ্রিদ। মধ্যমাঠের দখল নিয়ে একের পর এক আক্রমণে জুভের ডিফেন্স কাঁপিয়ে দিতে থাকেন রোনালদো, ইস্কোরা। ৬০ মিনিটে বক্সের বামপ্রান্ত থেকে এমনই একটি আক্রমণে টনি ক্রুসের শট জুভেন্টাসের ডিফেন্স দেওয়ালে লেগে প্রতিহত হয়ে আসলেও ফিরতি বলে ডি বক্সের অনেক বাইরে থেকে ক্যাসেমিরোর দুরপাল্লার জোড়ালো শটে বল আবারো বুফনকে ফাকি দিয়ে জুভেন্টাসের জালে। ৬১ মিনিট শেষে ২-১ এ এগিয়ে রিয়াল।

এক গোলের এডভান্টেজ পেয়ে আরো উজ্জীবিত খেলতে থাকে রিয়াল। যার ফলশ্রুতিতে দ্বিতীয় গোলের ঠিক ৩ মিনিটের মাথায়ই তৃতীয় গোল পেয়ে যায় তারা। ডিবক্সের ডানপ্রান্তে কার্ভাহালের সাথে ওয়ান টু ওয়ান খেলে বল নিয়ে বিপদজনক জায়গায় চলে যান মড্রিচ। সেখান থেকে ডিবক্সের মধ্যে করা তার মাইনাস থেকে জুভেন্টাসের থমকে যাওয়া ডিফেন্সের মধ্য দিয়ে পেছন থেকে দৌঁড়ে এসে ডান পায়ের আলতো টোকায় বল জালে জড়ান ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। সেই সাথে ১২ গোল নিয়ে মেসিকে টপকে এবারের প্রতিযোগিতার সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়া নিশ্চিত করেন বর্তমান এই বিশ্বসেরা খেলোয়ার। মুলত এই গোলের পরই ভেংগে পড়ে জুভেন্টাস। কিছুটা রিলাক্স মুডে খেলা শুরু করে রিয়ালও। এইসময় দুই কোচই দলে বেশ কয়েকটি পরিবর্তন আনেন। কিন্তু সেটি হিতে বিপরীত হয়ে পড়ে জুভেন্টাস কোচ মাসিমিলিয়ানো এলেগ্রির জন্য। ৬৬ মিনিটে মাঠে নেমে ১৮ মিনিটের মধ্যে দুইটি হলুদ কার্ড অর্থাৎ সেন্ট অফ অর্ডার পেয়ে মাঠ ছাড়েন জুভেন্টাসের বদলি খেলোয়াড় হুয়ান কুয়াদ্রাদো। ততক্ষণে ম্যাচ হাতের মুঠোয় নিয়ে নেয় রিয়াল। উলটো ৯০ মিনিট শেষে যোগ হওয়া অতিরিক্ত সময়ের প্রথম মিনিটে মাঠের বামপ্রান্তে প্রতিপক্ষের এক খেলোয়াড়কে বোকা বানিয়ে মার্সেলোর করা মাইনাসে পাঁ ছুইয়ে জুভেন্টাসের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকেন রিয়ালের বদলি খেলোয়াড় মার্কো এসেন্সিও।

৯৫ মিনিটের সময় রেফারির শেষ বাঁশির মধ্য দিয়ে শেষ হয় এই মহারনের। যাতে জুভেন্টাসকে ৪-১ গোলে হারিয়ে বিশ্বের প্রথম ক্লাব হিসেবে পরপর দুইবার “উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগ” জয়ের কৃতিত্ব দেখাল রিয়াল মাদ্রিদ। এই জয়ের মাধ্যমে আরো এক বছর ইউরোপ সেরার মুকুট নিজেদের কাছে রেখে দিল স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদের অভিজাতরা। ম্যাচ শেষে রিয়াল অধিনায়ক সার্জিও রামোসের কাছে হস্তান্তর করা ট্রফি এবং পরিবারের সদস্যদের নিয়ে করা উল্লাসের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে সমাপ্তি ঘটে ২০১৬/১৭ মৌসুমের শেষ ম্যাচ।

আরো পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *