Sunday, 24 Jun 2018

একান্ত সাক্ষাৎকারঃকিংবদন্তী গোলকিপার আমিনুল হক

বাংলাদেশ জাতীয় দলের কিংবদন্তীতুল্য সাবেক গোলকিপার , সাফ ফুটবল জয়ী দলের গর্বিত সদস্য আমিনুল হক , ফুটবল ম্যানিয়াক্সের মুখোমুখি হয়েছিলেন ফুটবল প্রেমীদের তার ব্যাক্তিগত ব্যাপারের কিছু আগ্রহ আর কৌতুহল মেটাতে ।সেই সাথে তিনি বাংলাদেশ ফুটবল এর অবস্থান , এ থেকে উত্তরনের পথ নিয়ে তার ভাবনা , দর্শকদের কি করনীয় এইসব ব্যাপারে খোলামেলা আলোচনা করেছেন । সময় নষ্ট না করে আমরা মূল অংশে চলে যাই

প্রশ্নঃ কেমন আছেন ?
উত্তরঃ ভালো আছি , আলহামদুলিল্লাহ ।

প্রশ্নঃ প্রিয় ক্লাব ?
উত্তরঃ যদি দেশের কথা বলেন , তাহলে যখন ছোটবেলায় খেলা শুরু করি , তখন একটা পছন্দ ছিলো । আর যেহেতু বাংলাদেশের ফুটবল আবাহনী এবং মোহামেডান কেন্দ্রিক ছিলো , ছোটবেলা থেকেই আবাহনীর ভক্ত ছিলাম । আর যখন খেলা শুরু করি তখন , যখন যে দলে খেলেছি সেই দলেরই ভক্ত। আর বিদেশী ক্লাবের কথা বললে , বার্সালোনার খেলা ভালো লাগে । ম্যানচেষ্টার ইউনাইটেড এর খেলা ভালো লাগতো, এখন হয়তো আগের মতো পারফর্ম করতে পারছেনা । আরো অনেক ক্লাবের খেলাই ভালো লাগে , বিশেষ কোন পছন্দ আসলে নেই ।

প্রশ্নঃ আপনার আইডল ?
উত্তরঃ যখন খেলা শুরু করি , তখন বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মুহসীন ভাইয়ের খেলা ভালো লাগতো । ওনার সাথে খেলার সুযোগ হয়নি । ওনার খেলা দেখেছি ছোটবেলায়, ওনার প্রতি একটা দুর্বলতা কাজ করেছে । সেজন্যই চাইতাম যদি ওনার মতো ভালো গোলকিপার হওয়া যায় কিনা, সে লক্ষ্যেই খেলা শুরু করা। আর বিদেশী গোলকিপার এর কথা যদি বলেন তাহলে পিটার্স মাইকেল নামক একজন গোলকিপার ছিলেন ডেনমার্কের , ম্যানচেষ্টার ইউনাইটেড এ খেলেছেন দীর্ঘদিন । অনেক কনফিডেন্ট একজন গোলরক্ষক ছিলেন।

প্রশ্নঃ এই সময়ের গোলকিপারদের ভিতরে কাকে ভালো লাগে ?
উত্তরঃ সর্বশেষ বিশ্বকাপের কথা যদি বলেন তাহলে জার্মানীর ম্যানুয়েল নুয়্যার এর খেলা ভালো লেগেছে, তাছাড়া চিলির ব্রাভো ও খুব ভালো গোল কিপিং করেছে , ওর খেলাও ভালো লেগেছে ।

প্রশ্নঃ গোলকিপার না হলে কোন পজিশনে খেলতেন?
উত্তরঃ (হাসি) সেভাবে তো আসলে কখনো ভাবা হয়নি । ছোটবেলায় যখন বড় ভাইরা খেলতেন পল্লবী মাঠে , একটা জিনিস হয় সবার ভিতরে যে ছোট থাকে তাকে গোলপোষ্টে দাঁড় করিয়ে দেয়া হতো । গোলরক্ষক পজিশনে কেউ খেলতে চাইতোনা , সবাই গোল করতে চায় । তো যখন খেলতে যেতাম , বড় ভাইরা আমাকে গোলপোষ্টে দাঁড় করিয়ে দিয়ে বলতেন , দাঁড়িয়ে থাক , আর কিছু করা লাগবেনা । ওভাবেই আসলে গোলকিপার পজিশনে যাত্রা শুরু , তারপর খেলতে খেলতে সখ্যতা । অন্য কোন পজিশনের কথা ভাবার সুযোগ হয়নি ।

প্রশ্নঃ মেসি না রোনালদো ?

উত্তরঃ আসলে দুইজন সম্পূর্ন দুই ধাঁচের ফুটবলার ,দক্ষতা ,মেধা দুইজনের আলাদা । তবে দুইজনের ভিতরে একজনকে বেঁচে নিতে বললে আমি অবশ্যই মেসিকেই বেছে নিবো । ওর ভিতরে একটা ন্যাচারাল ট্যালেন্ট আছে ,যেটা বিগত সময়ে ম্যারাডোনার ভিতরে দেখেছিলাম আমরা । ঐদিক থেকে বিবেচনা করলে আমি মেসিকেই এগিয়ে রাখবো । রোনালদো অবশ্যই খুব দ্রুত গতির ফুটবলার । দুইজনেরই দক্ষতা আছে দলকে বিপদ থেকে উদ্ধার করার , সেজন্যই আসলে ওনারা মেসি আর রোনালদো । যেহেতু দুইজন রাইভাল টিমে খেলে থাকেন , ক্রেজটাও তাই ফোকাস হয় ।

প্রশ্নঃএকটা সময়ে আমাদের ক্লাব ফুটবলের যে জনপ্রিয়তা , সেটা এখন একেবারেই নেই বলা যায় …

উত্তরঃএই ব্যাপারটা আমি একটু ভিন্নভাবে বলতে চাই । খেলাধূলাটাই আমাদের বিনোদনের মাধ্যম ছিলো , আমরা শুধু বিটিভি দেখতাম । সময়ের পরিবর্তে এখন টিভি খুললেই সারা পৃথিবীর খেলা দেখতে পারছি । বার্সালোনা – রিয়াল মাদ্রিদ নিয়ে নাহলে এতো উত্তেজনা কেনো, দেখছি তাই । আর আমাদের কথা যদি বলেন তাহলে এশিয়াতে না হলেও সাফ ফুটবলে আমরা ভালো পজিশনেই ছিলাম । জনপ্রিয়তাটা আসলে কমে গেছে কেনো ? গুটিকয়েক কর্মকর্তার কথা বলা যায় এইজন্য । একটা সময় বাংলাদেশ ফুটবলে মোহামেডান – আবাহনী চ্যাম্পিয়ন হবার জন্য দল গড়তো , এখন আবাহনী – মোহামেডানের কর্মকর্তাদের চ্যাম্পিয়ন হবার জন্য দল গড়ার মানসিকতাটা নেই । এখন আরো নতুন নতুন ক্লাব এসেছে , শেখ জামাল আছে , শেখ রাসেল আছে , মুক্তিযোদ্ধা আছে । যেহেতু প্রতিযোগীতা বেড়েছে , নতুন ক্লাবগুলো তাঁদের পয়সা নিয়ে আবির্ভাব হয়েছেন , ফাইনান্সিয়াল কারণে মোহামেডান -আবাহনী ভালো দল গড়তে পারছেনা , মোহামেডান -আবাহনী জৌলুস হারিয়েছে । আর দর্শকদের কথা যদি বলেন – বিনোদনের মাধ্যম ছিলো ফুটবল , আমরা এক সপ্তাহ আগে থেকেই জল্পনা কল্পনা শুরু করে দিতাম , কার ফ্ল্যাগ কতো বড়ো হয় সেটা নিয়ে প্রতিযোগীতা হতো । এখন হয়কি , বাংলাদেশের ফুটবলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যে ফলাফল সে কারণে কিন্তু দর্শক মাঠে যাচ্ছেনা । ফুটবলের জনপ্রিয়তা কমে গেছে সেটা বলবোনা , ক্রেজ টা আছে , ফুটবলের জন্য মানুষ এখনো পাগল । রেজাল্ট না থাকায় , দর্শক উপস্থিতি কমে গেছে , বিশেষ করে ঢাকা স্টেডিয়ামে। আসল বিষয় হচ্ছে বাফুফের কর্মকর্তা যারা আছেন ওনাদের ভাবতে হবে… বাংলাদেশের ফুটবল কোথায় যাচ্ছে , বাংলাদেশের মানুষ কি চায় । চাওয়া পাওয়ার মাঝে , প্রাপ্তি আর প্রত্যাশার মাঝে সমন্বয় না করতে পারলে কাঙ্খিত ফলাফল কখনোই আসবেনা।

প্রশ্নঃ জাতীয় দলে বিদেশী খেলোয়াড় খেলানো প্রসঙ্গে ?

উত্তরঃ বাংলাদেশী হিসেবে কখনোই চাইবোনা , একজন বিদেশীকে নাগরিকত্ব দিয়ে খেলাতে হবে । সেটা এই কারনেই চাইনা , আমরা ১৬ কোটি জনসংখ্যার দেশ , সেখানে ২০-৩০ জন ভালো ফুটবলার নেই , বিদেশী খেলোয়াড়কে নাগরিকত্ব দিয়ে , ধার করে এনে খেলাতে হবে , আমি এটা মানতে নারাজ । ভাবতে চাচ্ছিনা আসলে এভাবে। বাংলাদেশে প্রচুর পরিমাণে ট্যালেন্টেড ফুটবলার আছে , তাঁদের সঠিক পরিচর্যা দিয়ে মূল্যায়ন যদি করা হয় তাহলে অবশ্যই ভালো করবে । এই ধরনের চিন্তাটা কখনোই ইতিবাচক না। নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে । কথার প্রসঙ্গে আরেকটা কথা বলি , আমাদের ফুটবলের যে স্ট্রাকচার, সেটা এখনো আমরা সঠিকভাবে শুরু করতেই পারিনি আমি মনে করি । ফুটবলটা হয়ে গেছে ঢাকা কেন্দ্রিক , ফুটবল এমন একটা খেলা যেটা সারা বাংলাদেশের হওয়া উচিৎ । প্রত্যেকটি জেলা , উপজেলায় ঘরোয়া ফুটবলটা নিয়মিত হলে খেলোয়াড় সংকট টা কেটে যাবে, আমি বিশ্বাস করি ।

প্রশ্নঃ ক্রিকেটে যেমন পেসার হান্ট হয় সেভাবে কোন একটা প্রতিযোগীতার আয়োজন করে ফুটবলার বের করা যায়না ?

উত্তরঃ আসলে ফুটবলে তো সেভাবে সম্ভব না , আলাদা করে বাছাই করবো , যে স্ট্রাইকার বাছাই হবে , সে শুধু স্টাইকেই খেলবে । গোলকিপার হয়তো বাছাই করা যায় । আমরা আসলে একটা দীর্ঘ পরিকল্পনা করত পারি , পাঁচ বছরের একটা পরিকল্পনা হতে পারে। জেলাভিত্তিক লীগগুলো নিয়মিত হলে , সেখান থেকে ভালো ফুটবলারদের বাছাই করে এনে দল গড়ার জন্য যা যা করা দরকার তা করা উচিৎ , এটা একটা চলমান প্রক্রিয়া হওয়া উচিৎ। দশ বছর বয়সের বাচ্চাদের যেমন বয়স ভিত্তিক যে দলগুলো হয়ে থাকে , এই দলগুলোকে ধারবাহিকতার ভিতরে রাখা গেলে , ফুটবলারদের সংখ্যা অনেকাংশে বেড়ে যাবে এবং সংকট অনেকাংশে কেটে যাবে । বিদেশী ফুটবলারদের প্রসঙ্গে বলতে চাই ,

আমাদের সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক ফুটবলের যে ফলাফল , সেই দিক থেকে বিবেচনা করে ঘরোয়া ফুটবলে বিদেশী ফুটবলার পাঁচ বছরের জন্য অন্তত একেবারেই বন্ধ করে দেয়া উচিৎ।তা না হলে বাংলাদেশের ফুটবলের ভবিষ্যৎ অন্ধকারের দিকেই চলে যাচ্ছে । আমাদের প্লেয়ার সংকট এতোটা প্রকট হয়েছে যে ১৫-২০ জনের বাইরে চিন্তা করতে পারিনা , এই কয়জন দিয়েতো আর বাংলাদেশের ফুটবল চলবেনা ।

আর তাছাড়া বর্তমানে শেখ জামাল আর চট্টগ্রাম আবাহনীর মাঝে খেলোয়াড় নিয়ে যে টানাহেচড়া হচ্ছে সেটা শুধুমাত্র এই খেলোয়াড় সংকট এর কারণে । যদি পর্যাপ্ত খেলোয়াড় থাকতো তাহলে এই টানাহেচড়া কখনোই হতোনা।
প্রশ্নঃ আপনার ইংলিশ প্রিমিয়ার লীগে খেলার কথা ছিলো , কি কারণে আর হয়ে উঠেনি ?

উত্তরঃ শুধু ইংলিশ প্রিমিয়ার লীগে না , আমার সৌদি থেকেও অফার ছিলো । আমাদের যে জার্মান কোচ ছিলো , জর্জ কোটান , উনিও চেয়েছেন জার্মান লীগে খেলার জন্য । আসলে আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে যেটা হয়েছে , আমি একটা দেশ থেকে আরেকটা দেশে যাবো কিছু আইন মেনেই যেতে হবে , তো যখনই এমন কোন সুযোগ এসেছে বাফুফের কর্মকর্তারা কেনো জানি অনাগ্রহই প্রকাশ করেছে । তারা কেনো জানি চাননি । আর সে সময়ে আসলে আমাদের দেশে তেমন প্রেক্ষাপট ছিলোনা । আমি নিজে যে উদ্যোগ নিয়ে চেষ্টা করবো সেটা ও আর হয়নি । তবে হ্যা আমার কোচ কোটান , ডিডো ওনারা চেষ্টা করেছিলেন এই ব্যাপারে । ডিডো যখন ছিলেন , তখন দুর্ভাগ্যবশত আমি ইঞ্জুর্ড ছিলাম ,এইজন্য আর হয়ে উঠেনি । আর অন্যান্য সময়ে বাফুফে থেকে প্রপার সহযোগীতা না করার কারণেই সুযোগ গুলো কাজে লাগানো যায়নি ।

প্রশ্নঃ কোচিং এ আসার ইচ্ছে আছে কি ?
উত্তরঃ নাহ , আমি একদমই কোচিং এ যাবোনা । তবে বাংলাদেশের ফুটবল নিয়ে ভবিষ্যতে কাজ করার স্বপ্ন আমার আছে , শুধু ফুটবল নিয়ে না , বাংলাদেশের স্পোর্টস নিয়ে নার্সিং করার ইচ্ছে আছে । ক্রিকেট একটা ভালো স্ট্রাকচারে দাঁড়িয়ে গেছে , অন্য যে ব্যাক্তিগত ইভেন্টগুলো আছে ওখানেও ভালো সম্ভাবনা আছে বলে আমি মনে করি ।

প্রশ্নঃ ফুটবল ম্যানিয়াক্সদের উদ্দেশ্য কিছু বলবেন ?

উত্তরঃ আমি আমাদের যারা ফুটবল ভক্ত আছে , তাঁদের উদ্দেশ্য করে বলতে চাই ,ফুটবল এমন একটি খেলা সারা বিশ্বেই মানুষ পছন্দ করে। আমরা যারা বার্সালোনা কিংবা রিয়াল মাদ্রিদের সমর্থন করিছি , হয়তো মেসি – রোনালদোর কারনে বিদেশী দলগুলোর জন্য ফ্যানবেজ তৈরী হয়েছে । আমি মনে করি , তাঁর আগে বাংলাদেশের দলগুলোকে সাপোর্ট করা উচিৎ। আবাহনী , মোহামেডান , শেখ জামাল এই ক্লাবগুলোকে নিয়ে যদি তাঁদের এই আগ্রহ টা থাকে , ফ্যানবেজ গড়ে উঠে তাহলে সেটা আমার বাংলাদেশের ফুটবল এর জন্য অনেক বেশী পাওয়া হবে!

অবশ্যই বিদেশী দল সমর্থন করবে , তবে তাঁর আগে বাংলাদেশ এর ক্লাবগুলোর দিকে নজর দেয়া উচিৎ । দেশে পরিপূর্ন স্পোর্টস কালচার গড়ে উঠতে সাহায্য করা উচিৎ । বাংলাদেশের ফুটবলকে ভালোবাসা উচিৎ।( বাফুফের পেজে ফুটবল ভক্তদের আলোচনা প্রসঙ্গে) বাংলাদেশ ফুটবল নিয়ে ভাবনাগুলো শুধুমাত্র ফেসবুকে না থেকে , দৃশ্যমান করতে হবে । আমরা আমাদের ফুটবলকে ভালোবাসি , এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই এই ভাবনাটা দৃশ্যমান হওয়া উচিৎ । সমস্যা গুলো কি সেগুলো নিয়ে তারা কি ভাবছে তা বাফুফের কাছে চিঠি লিখে জানানো যায় । বাফুফে এবং ক্লাবগুলোর মাঝে খেলোয়াড় নিয়ে যে টানাহেচড়া এই ইস্যুগুলো নিয়ে বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে তাঁদের মনোভাব বাফুফেকে জানানো উচিৎ। বিষয়গুলো দৃশ্যমান হতে হবে , শুধু ফেসবুকে বিষয় টা যথেষ্ট হচ্ছেনা । ফেসবুক গ্রুপ গুলো থেকে ফ্যানবেজ তৈরী করা সম্ভব । ক্লাবগুলোর সাথে সম্পর্ক করা উচিৎ, তাহলে তারা বুঝতে পারবে বাংলাদেশ ফুটবলের জন্য দর্শক হিসেবে , ফুটবল প্রেমী হিসেবে ভূমিকাটা কি হতে পারে ।

 এতো ব্যাস্ততার মাঝেও আমাদের সময় দেয়ার জন্য অশেষ ধন্যবাদ আমিনুল ভাইকে ।

সাক্ষাৎকার গ্রহনেঃ মোহাম্মদ আল মামুন।

আরো পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *