Saturday, 21 Apr 2018

সীমানাহীন সম্রাট

এগারো বছর আগে যে ছেলেটা শুরু করেছিল,সে বোধহয় জানতো না সে এখানে পৌছবে,সে হয়তো জানতো না সে বদলে দেবে ফুটবল ইতিহাসের গতিপথ। ২০০৪ সালের ১৬ই অক্টোবর,কাতালান ডার্বির শেষদিকে স্টাইলিশ মিডফিল্ডার ডেকোর বদলি হিসেবে যখন সে মাঠে নেমেছিল,ত্রিশ নম্বর জার্সিটা তার গায়ে বড় হচ্ছিল,সাইজে একটু ছোটখাট বলে জার্সিগুলো তার গায়ে এখনও একটু বড় বড়ই দেখায়।

ম্যারাডোনার পর ফুটবল মাঠের সবুজ ঘাস মাড়িয়েছেন অনেক মাস্টারক্লাস,অনেকেই ফুটবলের ইতিহাসে প্রতিষ্ঠা করেছেন নিজের শাসনকাল,কিন্তু কখনোই,এত পরাক্রান্তভাবে নয়। ম্যারাডোনা পরবর্তী ফুটবলের মাস্টারক্লাস স্ট্রাইকার এসেছেন অনেক,রোমারিও,রোনালদো,বাতিস্ততা,স্টোইচকভ,হেনরি,ক্রেসপো,ক্লুইভার্ট,শেভচেন্কো,ফোরলান,ইব্রাহিমোভিচ,এরা একেকজন রাজত্ব করেছেন ডি বক্স বা তার আশেপাশে,দোর্দণ্ড প্রতাপে ডিফেণ্ডার আর কোচদের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছেন বছরের পর বছর ধরে।

মাস্টারক্লাস নাম্বার টেনও এসেছেন বেশ ক’জন।জিনেদিন জিদান,রোনালদিনহো গাউচো,লুইস ফিগো,ডেনিস বার্গক্যাম্প,রোমান রিকুয়েলমে,নামগুলো একটু বেশিই উচুদরের,জিদান তো নিজেকে নিয়ে গেছেন সর্বকালের সেরাদের হল অফ ফেমে,১৯৯৭ থেকে ২০০৬ এই দশ বছরে ফুটবল মাঠের রাজাধিরাজ ছিলেন জিজু। কিন্তু তাদের রাজত্বেও সীমা ছিল,হাফ লাইনের ওপর থেকে বক্স পর্যন্ত,মাঠের মাঝখানটা জুড়ে,রোনালদিনহোর এই সীমাবদ্ধতা ছিল না,কিন্তু তিনি জ্বলে উঠেই ধপ করে নিভে গেছেন,২০০০-২০০৬ মাত্র অর্ধ যুগের রাজত্ব ছিল তার,প্রতিভার চরমতম অপচয়।

ম্যারাডোনার পর মাঠের দুপাশ দাবড়ে বেড়ানো উইঙ্গারও এসেছেন অনেক,এরিক ক্যান্টোনা,বেবেতো,ডেভিড বেকহাম,আরিয়েন রোবেন,ফ্রান্ক রিবেরি,এই নামগুলো শুধু এই সময়েই না,বেচে থাকবে অন্য অনেক যুগ ধরেই,কিন্তু এদেরও রাজত্বের সীমাটা সাইডলাইন থেকে বক্সের প্রান্ত পর্যন্ত,প্রত্যেকের একেকটা সীমানা আছেযে সীমানার বাইরে তারা অনেকটাই ছন্নছাড়া।

ব্যতিক্রম সেই এগারো বছর আগে ডেব্যুট হওয়া ছোটখাট ছেলেটা,ত্রিশ থেকে কমে এখন তার জার্সি নাম্বার টেন,জগদ্বিখ্যাত বেশিরভাগ সম্রাটদের মতই সে আকারে একটু ছোট,কিন্তু তার সাম্রাজ্য বিশাল।রাইট সাইডলাইন থেকে শুরু করে লেফট সাইডলাইন পর্যন্ত সে মেশিনের মত ছুটতে পারে,হাফ লাইনের নিচ থেকে শুরু করে বক্সের সামনে আকা ডি পর্যন্ত সে প্রজাপতির মত উড়ে বেড়ায়,বক্সের ভেতরে তার উপস্থিতি পেলে, জার্ড মুলার বা পুসকাসদের মতই ভয়াবহ,বক্সের সামনে বা আশেপাশে সে জিদান বা স্টেফানোর মতই সমীহ জাগানিয়া,হাফলাইনের আশপাশ থেকে সে ম্যারাডোনার মতই সলো নিতে সক্ষম,ভয়ংকরসুন্দর এই ক্ষুধার্ত ফুটবলারের নাম লিওনেল মেসি,ফুটবলকে সে যে ভাবে শাসন করেছে,জিদানের পর আর কাউকে এভাবে শাসন করতে দেখা যায় নি,দু চার বছর ধরে নয়,আজ অন্তত নয় বছর ধরে।

২০০৪-২০০৬ তিনি ছিলেন লেফট উইং ফরোয়ার্ড,২০০৬-২০০৯ রাইট উইং ফরোয়ার্ড,২০১০-২০১৩ ফলস নাইন,২০১৪ তে আবার রাইট ফরোয়ার্ড,তারপর সেন্ট্রাল অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার,২০১৫ থেকে আবার ডিপ লায়িং ফরোয়ার্ড,কাম ফলস উইঙ্গার,এবং ২০১৫ সালের শেষে সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার,এতগুলো জায়গা থেকে ফুটবলকে ডিক্টেইট করা কেবল একজনের পক্ষেই সম্ভব,তিনি লিএ মেসি।
গোলের সামনে পেলের ফিনিশিং ট্রিকারি,উইংয়ে স্টেফানো-গারিন্ঞাদের সিল্কি স্কিল,বক্সের সামনে জিদানের ভিনগ্রহী কন্ট্রোল,হাফলাইন থেকে ম্যারাডোনার মতো সলো আর কিলার পাস,এতগুলো স্কিল একসাথে ফুটবল আর কখনো দেখেনি।

লিও মেসি তাই একজন সম্রাটের নাম,সীমানাহীন সম্রাট।

আরো পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *