Saturday, 26 May 2018

আলফিও বেসিল – ম্যারাডোনা ও মেসিকে কোচিং করানো একমাত্র ম্যানেজার

আসন্ন গ্রীষ্মে রাশিয়া বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা অবশ্যই চাইবে তাদের এত লম্বা দিনের জাতীয় দলের ট্রফি অর্জনের খড়া ঘুচাতে। এটা বিশ্বাস করা একটু কষ্টকরই বটে যে গত ২৫ বছরে অনেক তারকার ভিড় করেও কোনো ট্রফি জিততে পারেনি আলবিসেলেস্তারা। সর্বশেষ ট্রফি আসে সেই ১৯৯৩ সালে যেখানে এক ঝাঁক তারকার সমাহারে ওস্তাদ আলফিও বেসিল এনে দিয়েছিলেন আকাশী সাদাদের সর্বশেষ ট্রফি। তাহলে আসুন জানি সেই বেসিলের নেতৃত্বে কেমন ছিল আর্জেন্টিনা।

ইতালিতে অনুষ্ঠিত হওয়া ১৯৯০ বিশ্বকাপের ফাইনালে জার্মানির কাছে পরাজয়ের পরই সর্বত্র মনমরা ভাব দেখা যায় আর্জেন্টাইন শিবিরে। কার্লোস বিলার্দোর নেগেটিভ ট্যাক্টিক্স এর কারণে সেবার কঠোরভাবে সমালোচিত হয় আর্জেন্টাইন দল। টুর্নামেন্টে রেকর্ড ২২টি হলুদ কার্ড দেখে ম্যারাডোনার দল, সেই সাথে রয়েছে ওই টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ সংখ্যক লাল কার্ড।

দিয়াগো ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনা ফাইনাল পর্যন্ত গেলেও ওই এক ফাইনালের হারই হতাশ করে তুলে পুরো আর্জেন্টিনাকে। ম্যারাডোনা-বিলার্দো দুজনই ব্যর্থ হওয়ার দরুন জানিয়ে দেন দেশের হয়ে অব্যাহতি চান তাঁরা। দলের এই সংকটে এখন আকাশী সাদাদের প্রয়োজন নতুন দিক নির্দেশনা, যারা ম্যারাডোনার অনুপস্থিতিতেও দলকে সফলতার দিকে নিয়ে যেতে পারবে।

আর্জেন্টাইন ফুটবল এসোসিয়েশন নিয়োগ দিলেন আলফিও বেসিলকে আলবিসেলেস্তাদের নতুন শিক্ষক রূপে। বেসিল ছিলেন তখন রেসিং ক্লাবের ম্যানেজার। তাঁর অধীনেই ১৯৮৮ সালে সুপারকোপা লিবার্তাদোরস জিতে ক্লাবটি। রেসিং ক্লাবও ধীরে ধীরে সবার কাছে পরিচিত হয়ে যায় তাদের আকর্ষণীয় ফুটবল স্টাইলের কারণে। এছাড়াও বেসিলের ফুটবলীয় দর্শন অনেকটা সিজার লুইস মেনোত্তিরর অনুরূপ বলে অনেকের ধারনা। সবকিছু মিলে আর্জেন্টিনা দলকে আবার নতুনভাবে গঠন করার গুরু দায়িত্ব দেয়া হয় আলফিও বেসিলকেই।

দলের ম্যানেজার নিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে বেসিলের প্রথম কাজ ছিল ১৯৯১ সালের চিলিতে অনুষ্ঠিত হওয়া কোপা আমেরিকার জন্য দল গঠন করা নতুন উদ্যমে, নতুনভাবে বলীয়ান হয়ে। শুরু করলেন নতুন উদীয়মান খেলোয়াড় বাছাই করবার প্রক্রিয়া। ম্যারাডোনা-বিলবার্দো দর্শন থেকে অনেকাংশে সরে এসে নিজের মত করে সাজাতে লাগলেন নতুন আমেজে। পরবর্তীতে ম্যারাডোনা ড্রাগ টেস্টের কারণে ১৫ মাসের জন্য নিষিদ্ধ হলে কাজটা আরও সহজ হয়ে যায় বেসিলের জন্য। তিনি চোখ রাখেন ডামেস্টিক লীগে। উদীয়মান তারকাদের ধীরে ধীরে শনাক্ত করা শুরু করলেন। তুলে আনলেন লীগের সেরা ফরোয়ার্ড গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা, মিডফিল্ড মায়েস্ত্রো দিয়াগো সিমিওনিকে। এছাড়াও বেসিলের সংগ্রহ ভান্ডারে যোগ হয় লিওনার্দো এস্ত্রাদা, দিয়াগো লাতোরে, দারিও ফ্রাংকো, ফ্যাবিয়ান বাসুয়াল্দো, লিওনার্দো রদ্রিগেজ, এন্তোনিও মোহামেদ। দলের ভারসাম্য বজায় রাখতে বেসিল কিছু অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দেরও ডাক দিলেন। আকাশী সাদাদের অধিনায়কের দায়িত্ব দিলেন ৮৬ বিশ্বকাপজয়ী ডিফেন্ডার অস্কার রুগেরীকে। এছাড়াও সার্জিও গোয়কোচিয়া, ক্ল্যাদিও ক্যানিজিয়াকেও দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে রাখলেন।

বেসিলের অধীনে প্রথম ম্যাচেই রোসারিওতে হাঙ্গেরীকে ২-০ গোলে হারায় আর্জেন্টিনা। এরপরের টানা ৩ প্রীতি ম্যাচে ড্র করার ফলে চারপাশে সমালোচনা শুরু হয়ে যায় বেসিলের বিপক্ষে। তবে আর্জেন্টাইন ফুটবল এসোসিয়েশন সম্পূর্ণরূপে আস্থা রাখে তাঁর ওপর। ওয়েম্বলিতে ২-০ গোলে পিছিয়ে থেকেও ড্র নিয়ে মাঠ ছাড়ে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে। হার না মানা মানসিকতাই যেন বেসিলের আর্জেন্টিনাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করে।বেসিল নিজেও আত্মবিশ্বাস ফিরে পায়। তাকে যে কিছু করতেই হবে আলবিসেলেস্তাদের জন্য। সম্পূর্ন নির্ভার হয়েই চিলিতে পা রাখে বেসিলের আকাশী সাদারা। টুর্নামেন্ট শুরুও করে দুর্দান্তভাবে। গ্রুপ পর্বের সবগুলো ম্যাচেই জয়লাভ করে নতুনভাবে উজ্জীবিত আর্জেন্টিনা। ভেনিজুয়েলাকে ৩-০, প্যারাগুয়েকে ৪-১ গোলে হারানোর মধ্য দিয়েই প্রমাণ দিতে থাকে নিজেদের শক্তি। এরপর স্বাগতিক চিলিকে ১-০ গোলে, পেরুকে ৩-২ গোলে হারিয়ে গ্রুপ পর্বের সবগুলো ম্যাচই দাপটের সাথে জিতে নেয় বাতিস্তুতা-সিমিওনির আর্জেন্টিনা।

বর্তমানের মতো ফরম্যাট ছিলো না তখনকার কোপা আমেরিকা টুর্নামেন্টে। দুই গ্রুপ থেকে দুইটি করে মোট চার দল উঠবে সেকেন্ড রাউন্ডে। এরপর নিজেদের মধ্যে সবার সাথে ম্যাচ হয়ে যাদের পয়েন্ট বেশি থাকবে তারাই হবে কোপা আমেরিকার চ্যাম্পিয়ন।

‘এ’ গ্রুপ থেকে উঠে আর্জেন্টিনা এবং স্বাগতিক চিলি, অন্যদিকে ‘বি’ গ্রুপ থেকে জায়গা পায় ব্রাজিল এবং কলম্বিয়া। নিয়ম অনুযায়ী সেকেন্ড রাউন্ডের প্রথম ম্যাচটি হয় চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনা বনাম ব্রাজিলের। উত্তেজনায় ভরপুরে সে খেলায় ৩-২ এ জয় পায় বেসিলের শিষ্যরা। ব্রাংকোর বুলেট ফ্রিকিকসহ ২ গোল এবং বাতিস্তুতার গোলে জয়ের দেখা পায় আর্জেন্টিনা। ব্রাজিল আর্জেন্টিনার সাথে হারলেও চিলি এবং কলম্বিয়ার সাথে জয় নিয়ে বেশ ভালো একটা অবস্থানেই চলে যায়। এদিকে নিজেদের ২য় ম্যাচে চিলির সাথে ড্র করে পয়েন্ট হারায় আর্জেন্টিনা। টুর্নামেন্ট জিততে হলে শেষ ম্যাচে কলম্বিয়ার সাথে জয়ের কোনো বিকল্প ছিল না বেসিলের শিষ্যদের। সিমিওনি এবং বাতিস্তুতার গোলে ২-১ এ জয় পায় আকাশী সাদা জার্সিধারীরা। সেই সাথে আর্জেন্টিনা পায় তাদের ১৩তম কোপা আমেরিকা টাইটেল। বেসিলের এমন অসাধারণ সাফল্যে পুরো আর্জেন্টিনাই যেন এবার উৎসবে রমরমা।

দলের এমন সাফল্যে সমর্থক ও খেলোয়াড়দের আত্মবিশ্বাস তখন তুঙ্গে। সবাইই স্বপ্ন দেখা শুরু করলো ১৯৯৪ বিশ্বকাপ জয়ের। শুধু তারাই বা কেন, ফুটবল বিশ্বে তখন আর্জেন্টিনার প্রভাব ছিল পাহাড়ের ন্যায় সুউচ্চ।১৯৯২ সালেও বেসিলের আর্জেন্টিনা সফলতার তুঙ্গে। ওই বছর আর্জেন্টিনা জিতে নেয় আরো দুটি প্রীতি টুর্নামেন্ট। ওয়েলস এবং স্বাগতিক জাপানকে হারিয়ে জিতে কিরিন কাপ এবং উরুগুয়েকে হারিয়ে জিতে নেয় কোপা লিপটন। সে বছরই আর্জেন্টিনা নতুন দেখা পায় উদীয়মান ভার্সাটাইল মিডফিল্ডার ফার্নান্দো রেডন্ডোর। অতি দ্রুতই রেডন্ডোর ডিপ লায়িং প্লেমেকিং স্কিল বেসিলের অন্যতম হাতিয়ার হতে থাকে।

কোপা আমেরিকা জিতার জন্য আর্জেন্টিনা সুযোগ পায় কিং ফাহাদ কাপে অংশ নেয়ার। বর্তমানে এই টুর্নামেন্টটির বর্ধিত রূপ কনফেডারেশন কাপ। সেবার সৌদি আরবে অনুষ্ঠিত হয় এই কিং ফাহাদ কাপ।আইভরিকোস্ট, আর্জেন্টিনা, আমেরিকা এবং স্বাগতিক সৌদিকে নিয়েই অনুষ্ঠিত হয় এই কাপ। নিজেদের প্রথম ম্যাচে আফ্রিকান চ্যাম্পিয়ন আইভরি কোস্টকে ৪-০ গোলে উড়িয়ে দেয় বেসিল বাহিনী। ২ গোল করেন বাতিস্তুতা, বাকি ২টি করেন রিকার্ডো আল্তামিরানো ও আলবার্তো আকস্তা। ফাইনালে দেখা হয় স্বাগতিক সৌদির সাথে যারা আমেরিকাকে উড়িয়ে দেয় পূর্ববর্তী ম্যাচেই। জমজমাট ফাইনালে স্বাগতিকদের কাঁদিয়েই ৩-১ গোলে বীরের বেশে জয় নিয়ে ফেরে বেসিলের গর্বিত শিষ্যরা। রেডন্ডো হন টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়।টানা ২ বছর অপরাজিত থাকে আর্জেন্টিনা। বেসিল যেন এবার সত্যি সত্যিই আমেরিকা বিশ্বকাপ জয়ের রূপকার হতে যাচ্ছেন।

৯৪ বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে কলম্বিয়া, পেরু এবং প্যারাগুয়ে পরে আর্জেন্টিনার গ্রুপে। শক্তির হিসেবে খুব কঠিন হওয়ার কথা নয় বেসিল শিষ্যদের জন্য যারা ইতিমধ্যে ২ বছর অপরাজিত। বাছাইপর্বের পাশাপাশি কোপা আমেরিকা টাইটেল ধরে রাখারও লক্ষ্য আলবিসেলেস্তাদের।

এদিকে ১৯৯৩ সালের শুরুতেই ম্যারাডোনা ঘোষনা দেন তিনি জাতীয় দলে ফিরতে সম্পূর্নভাবে প্রস্তুত।সেভিয়ায় থাকা অবস্থায়ই ম্যানেজারসহ অনেকে সন্দিহান ছিলেন তাঁর ফিটনেস লেভেল নিয়ে। সবকিছু ছাপিয়ে বেসিল তাঁকে দলে ডাকলেন।

আর্জেন্টাইন ফুটবল এসোসিয়েশন তাদের শতবার্ষিক উৎসব উপলক্ষ্যে ব্রাজিলের সাথে এক প্রীতি ম্যাচের আয়োজন করে। ২ বছর পর ম্যরাডোনা দলে ফিরলেও ব্রাজিলের সাথে ড্র নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয় তাদের। এর ছয় দিন পরেই এ এফ এ আয়োজন করে আর্তেমিও ফ্রান্সি কাপ। আমন্ত্রণ করে ৯২ ইউরো জয়ী দল ডেনমার্ককে। ডেনিস ডিনামাইটরা তাদের সমস্ত শক্তি নিয়েই আর্জেন্টিনার বিপক্ষে মোকাবিলা করার প্রস্তুতি নেয়। আর্জেন্টিনায়ও এক রুগেরি(ব্রাজিলের বিপক্ষে লাল দেখায়) ছাড়া সবাই উপস্থিত। এক দারুন জমজমাট ম্যাচের অপেক্ষায়ই ছিল ফুটবল বিশ্ব।

নেস্তের ক্রাভিয়েত্তোর আত্মঘাতী গোলে শুরুতেই এগিয়ে যায় ডেনমার্ক। পরে ম্যাচের ৩০ মিনিটে ম্যরাডোনা-সিমিওনির দারুন বোঝাপাড়ায় ফাকায় বল পেয়ে যায় বাতিস্তুতা। বাতিস্তুতা মিস করলেও রিবাউন্ড থেকে গোল করে সমতায় ফেরান ক্যানিজিয়া। ১-১ গোলে খেলা শেষ হওয়ায় ম্যাচ গড়ায় পেনাল্টি শুট আউটে যেখানে ৫-৩ এ জিতে আরও একটি ক্রস-কন্টিনেন্টাল কাপ জিতে নেয় বেসিলের আর্জেন্টিনা। সেই সাথে বেসিলের অধীনে তখনো অপরাজিত তারা।

১৯৯৩ সালে কোপা আমেরিকা অনুষ্ঠিত হয় ইকুয়েডরে। টুর্নামেন্টের শুরু থেকেই আর্জেন্টিনা ফেভারিট। গ্রুপ পর্বে তাদের সাথে রয়েছে কলম্বিয়া, মেক্সিকো এবং বলিভিয়া। শক্তিমাত্রার বিচারে পরবর্তী রাউন্ডে যাওয়ার জন্য বেসিলের শিষ্যদের বেশি বেগ পোহানোর কথা না। কিন্তু বাস্তবে ঠিক যেন উল্টো ঘটে এবার। গ্রুপ পর্বের একমাত্র জয়টি পায় নিজেদের প্রথম ম্যচে বলিভিয়ার বিপক্ষে। পরবর্তী ২টি ম্যাচ ড্র নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয় তাদের। ২য় রাউন্ডে দেখা হয় ব্রাজিলের বিপক্ষে যারা গ্রুপ পর্বের ম্যাচ অনুযায়ী সেবার ছিলো ফেভারিট। ৩৯ মিনিটেই মুলারের অসাধারণ গোলে এগিয়ে যায় গ্রুপ পর্বের সেরা দল ব্রাজিল।এরপর আর্জেন্টিনা আপ্রান চেস্টা করেও গোল করতে না পারায় ১-০ তে এগিয়ে থেকে প্রথমার্ধ শেষ করে ব্রাজিল। বিরতির পরে বেসিল এবার নিজের মেধার আরো একবার প্রয়োগ ঘটান। সাব হিসেবে নামালেন লিওনার্দো রদ্রিগেজকে। ম্যাচের চিত্রও এবার পাল্টাতে থাকে। অবশেষে সেই রদ্রিগেজের দারুন হেডিং গোলেই ১-১ এ সমতায় ফেরে আলবিসেলেস্তারা।এরপর আর কোনো গোল না হলে খেলা গড়ায় পেনাল্টি শুট আউটে। ঠিক ডেনমার্কের বিপক্ষে যেমন আর্জেন্টিনা জয় নিয়ে ফিরেছিল ফ্রান্সি কাপে, এবার ব্রাজিলকেও এই শুট আউটে হারিয়েই সেমিতে জায়গা করে নেয় আলফিও বেসিলের অনুরাগীরা। সেমির প্রতিপক্ষ এবার কলম্বিয়া। এখানেও ম্যাচ ড্র হলে খেলা আবার গড়ায় পেনাল্টি শুট আউটে। ঠিক ব্রাজিলের বিপক্ষের অনুরূপ আবারও এই শুট আউটে জয় পায় আর্জেন্টিনা। পেনাল্টিতে ৫-৫ হলে সার্জিও গোয়কোচিয়ার শটে জয় নিয়ে ফাইনালে পা দেয় আকাশী সাদারা। ফাইনালের প্রতিপক্ষ মেক্সিকো। তাদের ফর্মও তখন তুঙ্গে। কিন্তু বাতিস্তুতার কল্যানে ম্যাচের শুরুতেই লিড নেয় ট্রফির সুবাস পেতে থাকা আর্জেন্টিনা। বাতিগোলের অসাধারণ পাওয়ারফুল শট মেক্সিকো কীপার জর্জ ক্যাম্পেস রুখতে ব্যর্থ হয়। লিড অবশ্য বেশিক্ষণ ধরে রাখতে পারেনি বেসিল বাহিনী। ৪ মিনিট পরেই পেনাল্টি থেকে গোল করে দলকে সমতায় ফেরান বেঞ্জামিন গালিন্দো। ম্যাচ যখন আবারো পেনাল্টি শুট আউটে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়, ঠিক তখনই দৈত্যবেশে আবারো গোল করে বসেন গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা। সেই সাথে আবারো জিতে নেয় কোপা আমেরিকা টাইটেল। আর্জেন্টিনার ১৪তম এবং বেসিলের ২য়। বেসিলের আর্জেন্টিনাকে তখন সবাই এক বাক্যেই বিশ্বসেরা দল হিসেবে মেনে নেয়।

এবার বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে মনোযোগ দেয়ার পালা। পেরু এবং প্যারাগুয়ের বিপক্ষে দুর্দান্ত ২ জয়ে উড়ন্ত সূচনাই করে সদ্য কোপা আমেরিকা চ্যাম্পিয়নরা। কিন্তু পরবর্তী ম্যাচে ২-১ গোলে কলম্বিয়ার কাছে হেরে যায় বেসিল শিষ্যরা। বেসিলেরও প্রথম হার আর্জেন্টিনার হয়ে। এক ঝাক উদীয়মান তারকা খেলোয়াড় নিয়ে বেসিলকে প্রথম হারের স্বাদ দেন ভালদেরামার কলম্বিয়া। পেলে ৯৪ বিশ্বকাপে তাঁর ফেভারিট হিসেবেও ঘোষণা করে এই কলম্বিয়াকে। এরপর নিজেদের মাঠে পেরুকে ২-১ গোলে হারালেও ড্র করে বসে প্যারাগুয়ের সাথে। এর ফলে বিশ্বকাপে জায়গা পেতে হলে কলম্বিয়ার বিপক্ষে জিততেই হবে আর্জেন্টিনাকে। প্রথমার্ধে ১-০ তে এগিয়ে থাকলেও দুর্দান্ত কলম্বিয়ার কাছে ৪ গোল হজম করে বেসিলের আর্জেন্টিনা। সেই সাথে বেসিলের অধীনে নিজেদের মাটিতে প্রথম হারের স্বাদ পায়। কলম্বিয়া দল পায় স্ট্যান্ডিং ওভ্যাশন। ম্যারাডোনাও গ্যালারী থেকেই ম্যাচ উপভোগ করেন। আর্জেন্টিনার যখন বিশ্বকাপ থেকে বিদায় প্রায় নিশ্চিত ঠিক তখনই যেন ভাগ্যদেবী তার নিজের যাদু দেখালেন। ড্র করে বসলো পেরু এবং প্যারাগুয়ে। এর ফলশ্রুতিতেই আমেরিকা বিশ্বকাপে জায়গা পাওয়ার জন্য প্লে অফ খেলার সুযোগ পায় আর্জেন্টিনা।

আন্তঃমহাদেশীয় প্লে অফে ম্যরাডোনাদের প্রতিপক্ষ অস্ট্রেলিয়া। বেসিলসহ পুরো আর্জেন্টিনা দলই যেন আকাশচুম্বী চাপে। ১ম লেগ খেলতে সিডনী পৌছায় কোপা চ্যাম্পিয়নরা। ম্যাচের ৩৭ মিনিটে ম্যারাডোনার কালজয়ী ক্রসে এবেল বালবাওর গোলে লিড নেয় আর্জেন্টিনা। ঠিক যখন বেসিল একটু শান্তির দীর্ঘশ্বাস টানবেন ঠিক তখনই টনি ভিডমারের গোলে সমতায় ফেরে ক্যাঙ্গারুরা। ১-১ এই ড্র নিয়ে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করে আকাশী সাদারা। পরবর্তী লেগে নিজেদের মাটিতে আলেক্স টবিনের গোলে আমেরিকা যাত্রা নিশ্চিত করে আলবিসেলেস্তারা। এবার যেন লম্বা করে এক দীর্ঘশ্বাস টানলেন বেসিল। দীর্ঘ এক মাসের আকাশচুম্বী চাপ থেকে যে এ যাত্রায় একটু অবসর পেলেন।

বিশ্বকাপ গ্রুপ পর্বে আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ গ্রিস, নাইজেরিয়া এবং বুলগেরিয়া। বেসিল যেন আরো একটু সুখের ঢেকুর তুললেন। এবার বিশ্বকাপ দল বাছাইয়ের পালা। বেসিল আগেই ঘোষণা দিয়েছেন ৩৩ বছর বয়সী ম্যারাডোনা আমেরিকা বিশ্বকাপে যাচ্ছেন দলের হয়ে। এদিকে ড্রাগের কারণে নিষিদ্ধ হওয়া ক্যানিজিয়াও ফিরছেন দলে। এ যেন বেসিলের সোনায় সোহাগা। দলে জায়গা নিশ্চিত করলেন বাতিস্তুতা, সিমিওনি, বালবো, রুগেরী, ভাজকুয়েজ, রেডন্ডো, রদ্রিগেজ, ক্যাসিরিস। গোয়কোচিয়াকে বেঞ্চে পাঠিয়ে তার জায়গায় আনলে ৮৬ বিশ্বকাপের লুইস ইসলাসকে। দলে আসলেন বেলো, হার্নান দিয়াজ এবং উদীয়মান তারকা এরিয়েল ওর্তেগা। ওর্তেগাই ছিল স্কোয়াডের সবচেয়ে তরুন, তাকেই ভাবা হতো ম্যারাডোনার উত্তরসুরী।

শুরু হয় আমেরিকা বিশ্বকাপ। বেসিলদের প্রথম ম্যাচ ক্ষুদ্র শক্তির গ্রীসের সাথে। তবুও বেসিল সবাইকে সতর্ক করে দিলেন হালকা ভাবে না নেয়ার জন্য। উদাহরণ হিসেবে টেনে আনেন ৮২ বিশ্বকাপে বেলজিয়ামের সাথে এবং  ৯০ বিশ্বকাপে ক্যামেরুনের বিপক্ষে হারের দৃষ্টান্ত।

ঝুঁকি নিয়েই বেসিল গ্রীসের বিপক্ষে নামান বাতিস্তুতা, ক্যানিজিয়া, বালবোর থ্রী ম্যান এ্যাটাক। ফলাফলও হাতে নাতে। মাত্র ২ মিনিটেই গোলের খাতা খুলেন বাতিস্ততা। প্রথমার্ধের শেষের ঠিক আগ মুহূর্তেই আরো এক গোল করে জয়ের সুবাস দিতে থাকেন বাতিগোল। ম্যাচের ৬০ মিনিটে ম্যারাডোনা-ক্যানিজিয়া-রেডন্ডোর দারুন বোঝাপাড়ায় ফাকায় বল পেয়ে যান ম্যারাডোনা। তাঁর বাম পায়ের দুর্দান্ত শটে ৩-০ তে লীড নেয় আর্জেন্টিনা। গোলের পর তাঁর আইকনিক চোখ ঢাকা উদযাপন ফুটবল বিশ্বে দারুন জনপ্রিয় হয়েছিল। ম্যাচের শেষদিকে বাতিগোলের পেনাল্টি গোলে ৪-০ তে জয় পায় বেসিলের শিষ্যরা। বাতিস্তুতাও পেয়ে যায় অসাধারণ এক হ্যাট্রিক।

পরবর্তী ম্যাচে আকাশী সাদাদের প্রতিপক্ষ সুপার ঈগল নাইজেরিয়া। প্রথম ম্যাচে বুলগেরিয়াকে ৩-০ গোলে উড়িয়ে দেয় আফ্রিকানরা। আর্জেন্টিনার সাথেও শুভ সূচনাই করে তারা। ম্যাচের ৮ মিনিটেই লীড নেয় নাইজেরিয়া। পরে বাতিস্তুতা এবং ক্যানিজিয়ার গোলে ২-১ এ জয় নিয়ে ২য় রাউন্ড নিশ্চিত করে ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনা।

ম্যারাডোনার কল্যানে সমস্ত আর্জেন্টিনা দল যেন উজ্জীবিত। প্রথম ২ ম্যাচে অসাধারন জয়ের পর ফেভারিটের তকমাটাও গায়ে লাগায় আলবিসেলেস্তারা। অনেক ফুটবল বিশেষজ্ঞদের মতে ৩য় বারের মতো সোনালী ট্রফিটা এবার আর্জেন্টিনায়ই যাচ্ছে। এসব গুন-গুঞ্জনে যখন আর্জেন্টাইন শিবির সয়লাব, ঠিক তখনই আসে অপ্রত্যাশিত এক আকস্মিক বজ্রপাতের মতো সংবাদ। নাইজেরিয়া ম্যাচের পর ম্যারাডোনাকে নিয়ে যাওয়া হয় তাঁর ড্রাগ টেস্ট করানোর জন্য। তাঁর রক্তে ‘ইফেড্রিন’ পাওয়া যায়,  যা এনার্জি ড্রিংক পানের ফলে হয়েছে বলে ধারনা করা হয়। ফলশ্রুতিতে তাঁকে বিশ্বকাপ থেকে তৎক্ষনাত নিষিদ্ধ করা হয়। ফলে আর্জেন্টিনা দলে যেন এক বিশাল শূন্যতার ফাঁকে পড়ে যায়। বেসিলের আর কোনো চয়েজ না থাকলে রদ্রিগেজকে দেয়া হয় প্লেমেকারের দায়িত্ব। মরার ওপর খড়ার ঘা হিসেবে আসে ক্যানিজিয়ার ইঞ্জুরী। পুরো স্কোয়াডই যেন তখন শঙ্কায় বিরাজমান। আবারো বেসিল তাঁর পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনতে বাধ্য হলেন।মাঝমাঠে মিডফিল্ড সৃজনশীলতার জন্য ভরসা রাখলেন তরুন ওর্তেগার ওপর।

ম্যারাডোনার অনুপস্থিতি হাড়ে হাড়ে টের পেল আর্জেন্টিনা। রিস্টো স্টয়চিকভ এবং নাস্কো সিরাকোভসাও এর গোলে ২-০ হেরে যায় বেসিলের শিষ্যরা। ফলশ্রুতিতে গ্রুপে ৩য় হয়ে পরবর্তী রাউন্ডে যায় ম্যারাডোনা -ক্যানিজিয়াবিহীন আর্জেন্টিনা।

নক আউটে প্রতিপক্ষ উড়তে থাকা রোমানিয়া। ওর্তেগাকে শুরুর একাদশে রেখে দল সাজালেন আলফিও বেসিল। ২০ বছর বয়সী ওর্তেগা ভয়কে জয় করেই যেন মাঠে নামলেন। ১-০ তে এগিয়ে যায় অসাধারণ খেলতে থাকা রোমানিয়া। তবে ওই ওর্তেগার দূরদর্শী পাসে বল পেয়ে যায় ডিবক্সে থাকা বাতিস্তুতা, পরবর্তীতে তাকে ফাউল করা হলে পেনাল্টি পায় আর্জেন্টিনা। পেনাল্টি গোলের মাধ্যমে দলকে সমতায় ফেরান বাতিগোল।পরবর্তীতে জর্জ হাগির মাস্টার ক্লাসে ৩-১ গোলে জয় পায় ইউরোপীয়ান দল রোমানিয়া। পাসাডেনার দর্শকরা অনেকেই বলেন জর্জ হাগির আজ পারফর্মেন্স ৩৩ বছর বয়সী ম্যারাডোনার চেয়েও নিঁখূত এবং চোখ ধাধানো ছিল। এভাবেই বিশ্বকাপ ফেভারিট তকমা পাওয়া দলটিই অনেক আগেই বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিয়ে বাড়ি ফেরে। বেসিলেরও বিদায়ঘন্টা বেজে যায় এই বিশ্বকাপে হতাশাজনক ফলাফলের কারণে।

আর্জেন্টিনা থেকে অব্যাহতির পর কোচিং করান মাদ্রিদ, সান লোরেঞ্জো, ক্লাব আমেরিকা, ক্লোন সান্তা ফের মতো ক্লাবকে। তবে শেষ পর্যন্ত বড় সফলতা আসে বোকা জুনিয়র্সের হয়ে ২০০৫ সালে। ক্লাবটির হয়ে জিতেন কোপা সুদামেরিকানা ও ২টি লীগ টাইটেল।

আবারও এএফ’র চোখ পড়ে বেসিলের ওপর। ২০০৬ বিশ্বকাপে পেকারম্যানের ব্যর্থতার কারণে তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন আলফিও বেসিল। বেসিলের অধীনে আবারো দুর্দান্ত খেলা শুরু করলো আর্জেন্টিনা। কিন্তু ২০০৭ সালে কোপা আমেরিকার ফাইনালে ব্রাজিলের কাছে হেরে শিরোপা হারায় বেসিলের আর্জেন্টিনা। এরপর ২০১০ বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে আর্জেন্টিনার দূর্বল পারফর্মেন্সের কারনে দলের স্বার্থে নিজে থেকেই সরে যান কোচের পদ থেকে।

২য় মেয়াদে ব্যর্থ হলেও ফুটবল ইতিহাসের পৃষ্ঠায় তাঁর অনন্য জায়গা রয়েছে। একমাত্র ব্যক্তি হিসেবে ম্যারাডোনা এবং মেসি দুজনকেই কোচিং করানোর কৃতিত্বটা তো শুধু তাঁরই। আর্জেন্টাইন ফুটবলে তাঁর লিগ্যাসিও কম না। একটা বিধ্বস্ত দলকে পুনর্গঠন করে ৯০ দশকে টানা ২ বার কোপা আমেরিকা জিতানো তাঁর মেধার পক্ষেই কথা বলবে। সেই সাথে প্রায় ২৮ মাস অপরাজিত, আলবিসেলেস্তাদের বিশ্বের শক্তিশালী দল হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। আর্জেন্টিনাকে দুবার অলিম্পিক স্বর্ণ জয়ের পেছনেও তাঁর অবদান অস্বীকার করার মতো নয়। দলের প্রতি তাঁর আত্মত্যাগ, বিসর্জন কখনোই কমতি ছিল না। বাতিস্তুতা, সিমিওনি, রেডন্ডো, বেলো, ওর্তেগার মতো তারকারা তো তাঁর নিজের হাতেই গড়া ছিল। লাতিন ফুটবলেও যে কজন ম্যানেজারের প্রত্যক্ষ প্রভাব ছিল তার মধ্যে বেসিল অন্যতম।

হ্যা, আলফিও বেসিল!
He deserves his place amongst the pantheon of Great Argentina managers.

আরো পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *