Sunday, 24 Jun 2018

অবশেষে হার মানলো চেলসি, তবে রেখে গেল কিছু চ্যালেঞ্জ

২২ই ফেব্রুয়ারি ২০০৬ থেকে ১৪ই মার্চ ২০১৮, দীর্ঘ ১২ বছর পর চেলসিকে ৯০ মিনিটের খেলায় হারাতে পারলো বার্সেলোনা! স্ট্যামফোর্ড ব্রীজে ২-১ জেতা সেই ম্যাচের পর ৮ বার চেলসির মুখোমুখি হয় এই কাতালান ক্লাবটি। কিন্তু ডাগআউটে গার্দিওলা-রাইকার্ডের মতো মাস্টারমাইন্ড, মাঠে মেসি-দিনহো-জাভি-ইনিয়েস্তা-ইতো-ভিয়ার মতো সুপারস্টাররা থাকার পরেও ৯০ মিনিটের খেলায় ব্লুজদের হারাতে পারেনি বার্সেলোনা! এওয়ে গোলের সুবাধে চেলসিকে সেমিফাইনাল থেকে বিদায় করতে পারলেও ৯০ মিনিটের স্কোরলাইনে জয়ী দলের নাম বার্সেলোনা ছিল না। অবশেষে লিটল ম্যাজিশিয়ান লিওনেল মেসির ম্যাজিকে দীর্ঘ ১২ বছর পর ৯ম দেখায় চেলসিকে ৯০ মিনিটের খেলায় হারাতে সক্ষম হলো বার্সেলোনা! ৩-০ গোলের স্কোরলাইন বার্সার আধিপত্য দেখালেও ভাগ্য পক্ষে না থাকলে উল্টো কিছুও হতে পারতো! ক্যাম্প ন্যু থেকে ৩-০ গোলের লজ্জা নিয়ে ফিরলেও কন্তের চেলসি ভালভার্দের বার্সাকে আগামী দিনের কিছু চ্যালেঞ্জের জানান দিয়েও গেল!

দুই দলই আগের লেগের ফর্মেশনে খেলতে নামে। বার্সার ৪-৪-২ এ আগের লেগের সাথে পার্থক্য ব্রাজিলিয়ান ওয়ার্কহর্স পাউলিনহোর জায়গায় ট্যালেন্টেড ইয়ং ফ্রেঞ্চ ব্লাড ওসমান ডেম্বেলে। চেলসির ৩-৪-৩ এ পার্থক্য এক্স কিউল পেদ্রোর জায়গায় এক্স গানার অলিভার জিরুডের অন্তর্ভুক্তি, যেখানে জিরুদ খেলে সেন্টার ফরোয়ার্ড পজিশনে আর আগের লেগে ফলস নাইন রোল প্লে করা হ্যাজার্ড উইঙ্গে।

৩-৪-৩ এ খেলা চেলসি ডিফেন্সিভলি ৫-৪-১ ফর্মেশনে ট্রান্সফর্ম হয়। এদিনও ট্রাঞ্জিশন সেইম ছিল, কিন্তু আগের লেগের তুলনায় চেলসি এই লেগে কিছুটা ওপেন খেলবে তা কিছুটা অনুমানযোগ্যই ছিল বার্সার এওয়ে গোলের আগে। তবে চেলসির গেম প্ল্যান কেমন ছিল তা ভালোভাবে দেখার আগেই চেলসি গোল হজম করে বসে! নিজ বক্সের সামনে ৫-৪-১ এর কম্প্যাক্ট জোনাল সিস্টেমে ডিফেন্স করা চেলসি দূর্গ ভেঙ্গে দেন লিওনেল মেসি। চেলসি এদিন আগের লেগের মতো সেন্টার এরিয়ায় ন্যারো জোনাল ব্লক ক্রিয়েট করে খেলার চেষ্টা করে, এতে করে দুই উইঙ্গে কিছু স্পেস খালিই ছিল। ২ মিনিটের মাথায় মেসি ডেম্বেলের সাথে ওয়ান টু ওয়ান করে সেই উইং/হাফ স্পেস দিয়ে চেলসির ডিফেন্সের পিছনে বল পাওয়ার এটেম্পট নেয়। ডেম্বেলে ব্যর্থ হয় মেসিকে রিটার্ন পাস দিতে, চেলসি ডিফেন্ডাররাও ব্যর্থ হয় বল ক্লিয়ার করতে। কিন্তু সুয়ারেজের ডেডিকেশনে মেসি ঠিকই চেলসি ডিফেন্স লাইনের পিছনে বল পেয়ে যায়। দুরূহ কোণ থেকে দুর্দান্ত নাটমেগ শটে চেলসি কিপার কোর্তোয়াকে বিট করে বার্সেলোনাকে ১-০ তে এগিয়ে দেন লিটল ম্যাজিশিয়ান।

গোল খাওয়ার পর চেলসি আক্রমণাত্মক খেলা শুরু করে, নিজেদের ডিফেন্স লাইন ও একটু উপরে উঠিয়ে আনে প্লাস বার্সাকে বার্সার হাফে হাইপ্রেস করা শুরু করে। চেলসির এটাকিং প্ল্যানটা ছিল দুই উইঙ্গার উইলিয়ান-হ্যাজার্ডকে ফ্রী-রোল দিয়ে উইং থেকে সেন্টারে চেপে যেতে দেওয়া এবং তাদের মাঝে পজিশন সোয়াপ করানো। হ্যাজার্ড-উইলিয়ান সেন্টারে চেপে যাওয়ায় বার্সার দুই ফুলব্যাক আলবা-রবার্তোও তাদের মার্ক করতে গিয়ে সেন্টারে চেপে যায় এবং বার্সার ফোর ম্যান ব্যাকলাইন সেন্টারে ন্যারো জোনাল ব্লক ক্রিয়েট করে। এতে করে চেলসির দুই উইংব্যাক আলোন্সো-মোজেস উইঙ্গে ফ্রী স্পেস পায় এবং চেলসির এটাক বিল্ড আপও ছিল এই দুই উইং এবং মোজেস-আলোন্সো নির্ভর। এটাকিং থার্ডে চেলসির ফাইনালাইজেশন পুরোপুরি ক্রস নির্ভর ছিল না, উইং থেকে বল দেওয়া হচ্ছিল উইলিয়ান-হ্যাজার্ডদের, এই দুইজনের পজিশন সোয়াপ প্লাস জিরুদের নিচে নেমে পিকে/উমতিতিকে ড্র্যাগ করার ফলে বার্সার ডিফেন্স লাইনে গ্যাপ ক্রিয়েট হচ্ছিল। সেই গ্যাপকে টার্গেট করে উইলিয়ান-হ্যাজার্ড-জিরুডদের ট্রায়াঙ্গুলার পাসিং প্রায়ই বার্সার ডি-বক্সে আতঙ্ক ছড়াচ্ছিল। দুই-একবার গোলের খুব কাছে গিয়েও ফিরে আসে চেলসি, কখনো স্টেগান-উমতিতি, কখনো লক্ষ্যভেদী শট আর কখনো উডওয়ার্ক – ভালো থ্রেট ক্রিয়েট করেও ভাগ্যের জোড়ে গোল বঞ্চিত থাকে চেলসি!

হাইপ্রেসিং এ দুর্বল চেলসি এদিনও বার্সার হাইপ্রেসিং এ কয়েকবার সমস্যায় পরে, তবে শর্ট পাসে হাইপ্রেসিং বিট করার বদলে চেলসি লং পাসেই স্বাচ্ছন্দ্য ছিল বেশি। ডীপ থেকে খেলা লং পাসগুলি ফিজিক্যালি স্ট্রং অলিভার জিরুড নিচে নেমে উইন করার চেষ্টা করছিল, জিরুড সবসময় লং বলগুলি না জিতলেও বার্সাকেও ঠিকমতো জিততে দিচ্ছিল না। আবার জিরুডকে ট্র্যাক করতে গিয়ে উমতিতি-পিকেরাও ডিসপ্লেসড হচ্ছিল। এই সুযোগটা উইলিয়ান-হ্যাজার্ড-আলোন্সোরা বেশ কয়েকবার কাজেও লাগায়। তবে চেলসির হজম করা দ্বিতীয় গোলের উৎসও প্রেসিং – মেসির ডেডিকেশন এবং প্রেসিং প্রিয় বন্ধুর কাছে বল হারান এক্স কিউল সেস্ক ফ্যাব্রিগাস। দুর্দান্ত ডেডিকেশন এবং ড্রিবলিং স্কিলের এরপর দুজন চেলসি ডিফেন্ডারকে বিট করে বল চেলসি ডি-বক্সে নিয়ে যান মেসি। লেফটে থাকা মেসির কাছ থেকে বল রিসিভের ভান করে ফেইক ফরোয়ার্ড রান মেইক করেন লুইস সুয়ারেজ। সুয়ারেজের সাথে ড্যাগ হন চেলসির আরো এক ডিফেন্ডার, এর ফলে রাইট পুরোপুরি ফাঁকা হয়ে যায় আর সে সুযোগটা কাজে লাগিয়ে চেলসি বক্সে রান মেইক করেন ওসমান ডেম্বেলে। মেসির দারুণ ভিশন এবং পাসে বল পায় ফাঁকায় থাকা ডেম্বেলে, ক্ষুদে জাদুকরের সেই অসামান্য রানটিকে বৃথা যেতে দেননি ডেম্বেলে – গোলার মতো এক শটে বার্সা জার্সিতে নিজের গোলের খাতা খুলেন তিনি, দলকেও এগিয়ে দেন ২-০ তে। বার্সেলোনাও বিরতিতে যায় ২-০ গোল এবং এগ্রিগেটে ৩-১ এর লিড নিয়ে।

বিরতির পর চেলসি হাইপ্রেসিং এর ইন্টেন্সিটি বাড়ায়। সেকেন্ড হাফের প্রথম ১৫ মিনিট বার্সাকে নিজেদের হাফে একপ্রকার বন্দী করে রাখে এসময়টা চেলসির হাইপ্রেসিং এর কোন জবাব খুঁজে পাচ্ছিল না বার্সা। হাফলাইনের আগেই চেলসি বারবার বল উইন করছিল এবং বার্সেলোনার ডি-বক্সে আতঙ্ক ছড়াচ্ছিল। ৬ বছর আগে ক্যাম্প ন্যুতে ২-০ তে গিয়েও ২-২ তে ড্র করার স্মৃতিও তখন অনেক কিউলের মনে উঁকি দিচ্ছে। ম্যাচে ৪৩% পজেশন রাখা চেলসি এই সময়টায় পজেশন রাখে ৫৭%, যার ৮০% ই বার্সার হাফে।

পরিস্থিতি বদলাতে ইনিয়েস্তাকে সাব করে পাউলিনহোকে নামানো হয়। ইঞ্জুরি থেকে ফেরা ইনিয়েস্তার এই সাবটা স্বাভাবিক হলেও এটার পিছনে ট্যাক্টিকাল কারণ ছিল চেলসির হাইপ্রেস বিট করতে লং পাস মেথডে যাওয়া। কারণ চেলসির হাইপ্রেসে বাধ্য হয়ে খেলা লং পাস গুলি সুয়ারেজ, মেসি, ডেম্বেলেরা এরিয়ালি জিততে পারছিল না। ফিজিক্যালি স্ট্রং পাউলিনহোর ইনক্লুশন বার্সার লং এরিয়াল বল জিততে এডভান্টেজ এনে দেয়। তাই সেকেন্ড হাফের প্রথম ১৫ মিনিটের চেলসির হাইপ্রেসিং ঝড় বাকি সময়টায় কমে আসে।

উল্টা এই সাবের কিছুক্ষন পর চেলসির প্রেসিং বিট করে কাউন্টার এটাকে উঠে বার্সেলোনা। সুয়ারেজের পাস থেকে মেসির দারুণ সলো রান এবং প্রথম গোলের পুনরাবৃত্তি করে নেওয়া নাটমেগ শটে আবারো পরাস্থ ২০১৩-১৪ সিজনে মেসির বিপক্ষে টানা ৭ ম্যাচ ক্লিন শিট রাখা থিবাওট কোর্তোয়া। এই গোলের মাধ্যমেই মূলত চেলসির কামব্যাক করার সকল আশা শেষ হয়ে যায়। চেলসি এরপরেও বেশকয়েকবার তাদের হাইপ্রেসিং এবং পজিশন সোয়াপ ফুটবল দিয়ে কয়েকটা চান্স ক্রিয়েট করে, কিন্তু সেগুলি আর আগের মতো ধারালো ছিল না!

চেলসি বাঁধা পার হবার পর শেষ আটে বার্সেলোনার নেক্সট বাঁধা ইতালিয়ান ক্লাব রোমা! তবে শেষ দুই ম্যাচে চেলসি ভালভার্দের নেক্সট কিছু চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে আগাম বার্তা দিয়ে গেল!

এই সিজনে বার্সা সংগ্রাম করসে দুই টাইপ ট্যাক্টিক্সের বিপক্ষে –

১. ডীপ সিটিং, সেন্টার ওরিয়েন্টেড কম্প্যাক্ট জোনাল ডিফেন্স সিস্টেম

২. এগ্রেসিভ হাইপ্রেসিং সিস্টেম

জানা কথা আগের অপ্রতিরোধ্য বার্সেলোনার অন্যতম কান্ডারি রেজিস্তা জাভি নাই, রাইট ফ্যাংকে আতঙ্ক ছড়ানো রাইটব্যাক দানি আলভেজ নাই এবং এই সিজন থেকে নাই নেইমার জুনিয়র! এদের অভাব বার্সেলোনার ক্রিয়েটিভিটি কমিয়ে দিয়েছে আগের তুলনায়। মেসি-সুয়ারেজ-ইনিয়েস্তার কল্যাণে অনেক ম্যাচ বের হয়ে আসলেও বাস পার্কিং দলগুলির বিপক্ষে বার্সা সংগ্রাম করছেই গোল পেতে। লাইক ভ্যালেন্সিয়া, এটিএম, চেলসি ম্যাচ। এই ম্যাচগুলি বার্সা পার পাইসে মেসি, সুয়ারেজ, ইনিয়েস্তার ইন্ডিভিজ্যুয়াল ব্রিলিয়ান্স দিয়ে, নট বাই টিম ট্যাক্টিক্স ওর টিম এফোর্ট!

লা লীগায় বিলবাও, সেল্টা, এইবারের মতো দলগুলি এগ্রেসিভ হাইপ্রেসিং দিয়ে বার্সার বিল্ড আপে ভালো সমস্যা ক্রিয়েট করছে। লাস্ট এল ক্লাসিকোতেও ফার্স্ট হাফে রিয়াল অনেক ভীতি ছড়াচ্ছিল এই এগ্রেসিভ হাইপ্রেসিং দিয়ে। জাভি না থাকায় অপোনেন্টের হাইপ্রেসিং বিট করে বল আউট করার পুরো দায়িত্ব বলতে গেলে ঐ বুস্কেটসের ঘাড়েই! বুস্কেটস ঠিকমতো না খেললেই বার্সার খেলা নস্ট হয়ে যায় এই হাইপ্রেসিং এ!

আর আরেকটা উইকনেস চেলসি  আঙ্গুল দিয়ে দেখালো তা হলো “পজিশন সোয়াপ” ফুটবলের বিপক্ষে বার্সার ডিফেন্সের উইকনেস! আগের লেগ প্লাস এই লেগেও হ্যাজার্ড-জিরুডদের পজিশন এক্সচেঞ্জ বার্সার ডিফেন্সিভ শেইপ ব্রেক করে ঝামেলায় ফেলেছে।

রিয়াল মাদ্রিদ বাদ দিলে বার্সার ৬ষ্ঠ ইউসিএল জয়ের পথে বাকি বড় চ্যালেঞ্জাররা হচ্ছে হেইংক্সের বায়ার্ন, গার্দিওলার সিটি, আলেগ্রির জুভেন্টাস এবং ক্লপের লিভারপুল। আলেগ্রি জুভেন্টাস ডিফেন্সিভলি কতোটা ভোগাতে পারে এই ক্রিয়েটিভিটিলেস বার্সেলোনাকে তার উদাহরণ দেখতে চাইলে বেশিদূর যাওয়া লাগে না। হেইংক্সের বায়ার্ন এটিএমের মতো কম্প্যাক্ট ডিফেন্সিভ অর্গানাইজেশনের পাশাপাশি প্রেস করেও ঝামেলায় ফেলবে। তাসের ঘরের ডিফেন্সখ্যাত লিভারপুলকে সহজ প্রতিপক্ষ মনে হতে পারে, কিন্তু এই মুহুর্তে সবচেয়ে কড়া হাইপ্রেসিং করে কিন্তু ঐ ক্লপের লিভারপুলই! তার সাথে ধরেন সালাহ-মানে-ফিরমিনোকে।

আরো একটা দল আছে সেটা হলো গার্দিওলার ম্যানচেস্টার সিটি – এই দল ও এগ্রেসিভ প্রেসিং করবে, এরিয়াল জিতবে এবং সাথে পজিশন সোয়াপ ওর টোটাল ফুটবলের স্বাদ দিবে – যা চেলসির টোটাল ফুটবল থেকে কঠিনতর হবে! সেই সাথে এডারসন, ওতামেন্দ্বী, স্টোনস, ফার্নান্দিনহোদের পাসিং স্কিল যোগ করেন – বার্সার হাইপ্রেসিং এরাও এ মুহুর্তে বিট করার ক্ষমতা রাখে!

অতএব, ভালভার্দেকে এই ৩ সমস্যার সমাধান কোয়ার্টারের আগেই বের করে রাখতে হবে। নাহলে সামনে বিপদ হতে পারে, কারণ আসল খেলা এখন শুরু হবে!

আরো পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *