Saturday, 21 Apr 2018

মৃত্যু পরোয়ানা মাথায় নিয়ে ফুটবল ম্যাচ

প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করে আফ্রিকান দেশ জায়ারে। স্বপ্ন এবং প্রত্যাশা দুটোই ছিল তুঙ্গে। ভালো কিছু উপহার দেয়ার স্বপ্নে বিভোর হয়েই পশ্চিম জার্মানিতে পা দেয় জায়ারের ঐতিহাসিক ফুটবল দলটি।

১ম ম্যাচেই স্কটল্যান্ডের কাছে ২-০ তে হেরে যায় আফ্রিকান চিতাবাঘরা। কিছুটা হতাশ হলেও হাল ছেড়ে দেয় নি জায়ারিয়ানরা। প্রস্তুত হতে থাকে পরবর্তী ম্যাচের জন্য যুগোস্লাভিয়ার বিপক্ষে। গ্লেসেনকিরচেন স্টেডিয়ামে অপ্রত্যাশিতভাবে ৯-০ গোলে হেরে যায় মুয়াম্বা, মানতান্তু, বোবার জায়ার দল।

খবর চলে যায় তৎকালীন জায়ারের মিলিটারি ডিক্টেটর এবং প্রেসিডেন্ট মোবুতু সেসে সেকোর কাছে। রেগে আগুন এই স্বৈরাচারী পশ্চিম জার্মানিতে সংবাদ পাঠান যে পরবর্তী ম্যাচে ব্রাজিলের কাছে ৩টার বেশি গোল খেলে প্রত্যেকের মস্তক ছিন্ন করবেন। খবর শুনে জায়ারের খেলোয়াড়রা স্বভাবতই আতঙ্কে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েন। অনেকে তো বেঁচে থাকার আশাই ছেড়ে দেন। কারণ আদেশটা ছিল তাদের ডিক্টেটরের আর পরবর্তী ম্যাচ তৎকালীন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের বিপক্ষে।

ভয়কে জয় করেই গ্লেসেনকিরচেন এ আবার নামে জায়ার। প্রতিপক্ষ ঐতিহাসিক জুলেরিমে ট্রফি নিয়ে যাওয়া হলুদ জার্সিধারী ব্রাজিল। জার্মানির স্থানীয় সময় ৪ টায় ৩৬,২০০ জন দর্শকের সামনে মাঠে নামে ধুকতে থাকা জায়ার। ম্যানেজার ব্লাগয়ে ভিদিমিচ কিক অফের সময় কেঁদেই দিয়েছেন।

খেলা বুঝে ওঠার আগেই মাত্র ১৩ মিনিটে জার্জিনহোর গোলে এগিয়ে যায় সেলেসাওরা। ভয় যেন ক্রমশই বাড়তে থাকে জায়ারিয়ান শিবিরে। আতঙ্কগ্রস্থ হয়েই বিরতিতে যায় চিতারা।

দ্বিতীয়ার্ধেও খেলা হলুদদের দখলে। ফলস্বরূপ ৬৭ মিনিটে রিভেলিনোর গোল। ৭৯ মিনিটে ভলদোমিরোর গোলে ৩-০ লিড নেয় ব্রাজিল। এবার যেন প্রত্যেক খেলোয়াড়, ম্যানেজার এর চোখে জীবন বলি দেয়ার করুণ চিত্র ফুটে উঠেছে।

ম্যাচের সবচেয়ে আকর্ষনীয় মুহূর্ত যা বিশ্বকাপ ইতিহাসে বিরল- ঘটনাটি ঘটে ৮০ মিনিটের সময়। ২৭ গজ দূরে ফ্রি কিক পায় ৩বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। ২ গোলস্কোরার রিভেলিনো এবং জার্জিনহো ফ্রি কিক নেয়ার জন্য বলের কাছে দাঁড়ায়। পুরো জায়ার দল যেন মৃত্যুর ঘ্রান পাচ্ছে খুব কাছ থেকেই। আর ১টি গোল খেলে যে কেউই স্বমস্তক নিয়ে দেশে ফিরতে পারবে না।

সেই সময়টাতেই ওয়েপু ইলুঙ্গা নিজেদের ওয়াল থেকে দৌড়ে এসে বলে জোড়ে কিক করে পাঠিয়ে দিলেন মাঠের অপর প্রান্তে। বিশ্বকাপ ফুটবলে এমন ঘটনার স্বাক্ষী ওই একবারই। মৃত্যুতে যদি পিঠ ঠেকে যায় তাহলে ফুটবলের নিয়ম ভাঙলে আর কিই বা আসে যায়। অবশ্য লং কিক করার পরে ইলুঙ্গাকে সাথে সাথেই হলুদ কার্ড দেখায় রেফারী নিকোলা রায়নিয়া। ম্যাচ শেষে অবশ্য রায়নিয়াকে নিয়ে অনেকে মন্তব্য করে যে তার মানবতা বলতে কিছু নাই। তার জীবন নিয়ে এমন সংশয় থাকলে সেও এমনটাই করতো।

এর পর অবশ্য বাকি ১০ মিনিট আর গোল হজম করতে হয়নি আফ্রিকান চিতাদের। শেষ বাঁশি দেয়ার সাথে সাথে কোচ, কর্মকর্তা, সাবস্টিটিউট খেলোয়াড় সবাই মাঠে নেমে জড়িয়ে ধরে যে যাকে পারছে। প্রত্যেকে যেন নতুন করে জীবন ফিরে পেয়েছে। কেউ দূর থেকে দেখলে বুঝবেই না যে ম্যাচটি ছিল একটা গ্রুপ পর্বের ম্যাচ আর তাতে ৩-০ গোলে হেরেও এমন উদযাপন। কিন্তু ভেতরে ছিল একটি দলের জীবন-মরণ নিয়ে প্রশ্ন।

ম্যাচ শেষে অবশ্য ব্রাজিল কাপ্তান পিয়াজ্জা বলেন আমার ক্যারিয়ারে এর চেয়ে সুন্দর, আবেগী মুহূর্ত আর দেখতে পাবো না।

বেঁচে গেলো জায়ার ফুটবল দল। ফুটবল বিশ্ব দেখলো ইলুঙ্গার অমর কীর্তি। জায়ারিয়ান এই ডিফেন্ডারের কার্যকলাপ দেখে স্বৈরাচার মোবুতু হয়তোবা নিজেই বুঝতে পেরেছিলেন কতটা ভয়, আশংকা, আতঙ্ক নিয়েই বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের সাথে ম্যাচটি পার করেছিলেন তার দেশের লড়াকুরা।

২২ জুন, ১৯৭৪। ফুটবল ইতিহাসের পাতার একটি আতঙ্কিত দিন, জীবন না হারানো গল্পের দিন। অমর ইলুঙ্গার অমর ঘটনার দিন!

আরো পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *