Sunday, 24 Jun 2018

সিলভা-মিরান্ডার খুঁটিনাটি, তিতের বিল্ডআপের ত্রুটি

২০১৮ বিশ্বকাপ জয়ের অন্যতম দাবিদার ধরা হচ্ছে তিতের ব্রাজিলকে। বিশ্বকাপ প্রস্তুতির শেষ মুহুর্তে এসে মোটামুটি অনেকটাই গোছানো হয়ে গেছে টিম প্ল্যান। তিতের ফেভারিট ফর্মেশন ৪-৩-৩। মডার্ণ ফুটবলের এই যুগে এসে দলগুলো পুরো ম্যাচেই অল সিচুয়েশনে সেইম ফর্মেশনে খেলে না, তিতেও সেইম, ডিফেন্সের সময় ব্রাজিল তাদের ব্লকে ৪-৪-২ অথবা ৪-১-৪-১ শেপ নেয়। ব্রাজিল হাই ডিফেন্স লাইন মেইনটেইন করে না। তাদের ডিফেন্সিভ লাইন খুবই লো, অনলি ২৩ মিটারস ফ্রম ব্যাক। সিলভা এবং মিরান্ডা দুইজনেরই ফেভারিট ডিফেন্সিভ টেকনিক হল কিছুটা পিছনে সরে এসে ডেপথ কাভার দেয়া। সেজন্য এভাবে খেলায় তারা বাড়তি অ্যাডভান্টেজ পায়।

রিয়াল মাদ্রিদের মত সিলভা, মিরান্ডা তাদের পিছনে কখনোই বেশি স্পেস রাখে না, ফলে ডেপথ কাভার দিতে সুবিধা হয়। গোলকিপার অ্যালিসনের সুইপিং অ্যাবিলিটি বাড়তি সুরক্ষা ব্রাজিলের ডিফেন্সে। যখন পাউলিনহো একাদশে থাকে, ডিফেন্সের সময় সে মিডফিল্ড থেকে স্টেপআউট করে উপরে উঠে ফ্রন্টে খেলা সেন্টার ফরোয়ার্ডের সাথে মিলে ৪-৪-২ শেপ তৈরি করে, অপনেন্টের বিল্ডআপ ব্লক করা তার কাজ, তখন দুই উইঙ্গার হালকা পেছনে মুভ করে। আলভেজ যখন থাকত, আলভেজের অ্যাগ্রেসিভ পজিশনিং এর সময় উইলিয়ান নিচে নেমে তাকে কাভার দিত, দানিলো এক্ষেত্রে আলভেজের চেয়ে বেশি কেয়ারফুল। কিন্তু প্রেসিংয়ের অ্যাগেইন্সটে ঠান্ডা মাথায় প্রেসিং নিউট্রালাইজ করার ক্ষেত্রে দানিলো ভালনেরাবল আলভেজের চেয়ে, এখানে ব্রাজিল আলভেজকে মিস করবে। অপনেন্ট লাস্ট থার্ডে যখন বল নিয়ে আসে, ঠিক তখনই ডিফেন্স স্টেপ ব্যাক করে বক্সের ইনসাইডে যায়।

ডিফেন্সিভ অ্যাপ্রোচিংয়ের ক্ষেত্রে ব্রাজিলের মূলমন্ত্রই হচ্ছে মিডফিল্ডের সেন্টারে কম্প্যাক্ট শেপ ধরে রেখে প্রতিপক্ষকে মাঝমাঠ দিয়ে কোনো স্পেস না দেয়া, উইঙ্গে খেলতে বাধ্য করা। সেজন্য তিতের ব্রাজিল সবসময় হাই প্রেসিং করেও না। অনলি উইংয়ে পাস দিলে, উইংয়ে লং বল খেললে, ব্যাকপাস দিলে তারা হাই প্রেস করে। ব্রাজিল ৪-১-৪-১ এ সুইচ করে মাঠের মিডল পার্টে অ্যাক্সেস ব্লক করে, একই সাথে ওয়াইডেও ভাল কাভার দেয়। কম্প্যাক্ট শেপ থাকা অবস্থায় উইংয়ে প্রতিপক্ষ লং পাস খেললে, মোস্টটাইম ফুলব্যাক গিয়ে পাস রিসিভের টাইমে গিয়ে প্রেস করে। এভাবে খেলায় ব্রাজিলকে উইং থেকে প্রচুর অ্যাটাক ব্লক করতে হয়, ক্রস ক্লিয়ার করতে হয়। ক্যাসেমিরো ডিফেন্সিভ মিডফিল্ড পজিশনে ব্রাজিলের জন্য ব্লেসিংস, পুরো টিমে ডিফেন্সিভ ব্যালেন্স এনে দেয় তার উপস্থিতি। তার সামনে থাকা মিডফিল্ডারদের পজিশনিংয়ের কারণে সে যখন ব্যাকফোরের সামনে থাকে তখন ব্রাজিলের সিস্টেম ৪-১-৪-১ এ দেখা যায়।

ক্যাসেমিরোর জন্যই ব্রাজিল এখন সিঙ্গুলার পিভটে খেলে, এর আগে ডুয়াল পিভটে খেলতে দেখা যেত। তার সাথে ফার্নান্দিনহো, পাউলিনহো যেই খেলুক না কেন তারা সহ ব্যাকফোর সবাই থাকে ডিফেন্স অরিয়েন্টেড, যদিও পাউলিনহোর পাসিং অ্যাবিলিটি নিয়ে প্রশ্ন আছে।

ক্যাসেমিরো ব্যাকে ড্রপ করে সেন্টারব্যাকদের মাঝেও জায়গা নিতে পারে, তখন রিয়াল মাদ্রিদের মত অপজিশন অ্যাটাকের অ্যাগেইন্সটে ব্রাজিল অপনেন্টকে আউটনাম্বারড করে। লেফটে মার্সেলোকে ব্যাকআপ দিতে থাকে ফার্নান্দিনহো, মার্সেলো বিশ্বের অন্যতম সেরা লেফটব্যাক হলেও প্রায়ই তার পিছনে থাকা প্লেয়ার দ্বারা ধরা পরে, তাকে বিট করে পাস ইজিলি পিছনে চলে যায়, তার রেখে আসা স্পেস দিয়ে তখন ওই প্লেয়ার অ্যাটাকে উঠে। আলভেজ, দানিলোর ক্ষেত্রে এটা হয় না।

সেটপিস ডিফেন্ডিংয়ে ব্রাজিলের ফেভারিট জোনাল ডিফেন্ডিং। সেটপিস ব্রাজিলের জন্য আলাদা কন্সার্ন। ইভেন মিরান্ডাকে বাদ দিয়ে মার্কুইনহোসকে স্কোয়াডে যদি আনেও তবু এরিয়াল ডুয়েলে মার্কুইনহোস স্ট্রাগল করে। কর্নারের সময় ব্রাজিল জোনাল ডিফেন্ডিং করে, সিক্স ইয়ার্ড বক্সে ৬ জন প্লেয়ার থাকে, আর ২ জন থাকে পেনাল্টি বক্সে।

ভাল জোনাল ডিফেন্ডিংয়ের সিক্রেটই হল বলের জন্য অপেক্ষা না করে ডিফেন্ডাররা বক্সের ভিতরে মুভ করা, ব্রাজিল সেটা ভালভাবেই করে। একইসাথে অপনেন্টের ১/২ জন ভাল হেডারকে ব্রাজিল ম্যানমার্কিংও করে রাখে অপোনেন্ট বুঝে। ফ্রিকিক ডিফেন্ডিংয়েও ব্রাজিল জোনাল মার্কিং করে।

সিলভা, মিরান্ডা, মার্কুইনহোস এর মধ্যে একমাত্র সিলভাই ক্রস ক্লিয়ারে স্পেশালিস্ট। মিরান্ডা সিলভা থেকে লম্বা হওয়ার পরেও ক্রস ক্লিয়ারে তার দূর্বলতা অনেক। প্রতিপক্ষ এর সদ্ব্যবহার করতে পারলে বলা যায় ব্রাজিল ডিফেন্সের সবচেয়ে বড় উইক পয়েন্ট এটা। মার্কুইনহোস লাস্ট বেশ কয়েক ম্যাচে ফর্মহীন থাকায় এখন সে মিরান্ডাই তিতের রাডারে। ব্রাজিলের লাস্ট কয়েক ম্যাচে কম্পেয়ারলি ক্লিয়ারে সে পিছিয়ে থাকার পাশাপাশি পিএসজির হয়ে সিজনের শেষ দিকে তেমন ভাল না করায় মিরান্ডাই এখন তার তুলনায় তিতের বেশি পছন্দ। কিন্তু মিরান্ডার মধ্যে এমন কি আছে যার জন্য তিতে ওকে ভরসা করেন? ট্রুলি বলতে ১v১ ডুয়েলে সিলভা, মিরান্ডা ডেডলি। ১v১ এ সিলভা আনবিটেবল, কিন্তু মিরান্ডা ক্রস ডিফেন্ডিংয়ে দূর্বলতার জন্য প্রায়ই ক্রিটিক্যাল সিচুয়েশন ক্রিয়েট হয়। এর বাইরে গ্রাউন্ড পাসিং ব্লকের ক্ষেত্রে মিরান্ডা এক্সপার্ট। সিলভা, মিরান্ডাকে ড্রিবল পাস্ট করে বল যাওয়ার পসিবিলিটি খুবই কম, সিলভার ক্ষেত্রে এই রেট পার গেইম ০.৪, মিরান্ডার ক্ষেত্রে সেটা আরও ঈর্ষণীয়, মাত্র ০.১! সেজন্য ইনসাইড বক্সে ৯০% ক্রস ক্লিয়ার করার ক্ষেত্রে দায়িত্বটা মিরান্ডার পরিবর্তে সিলভার উপরেই। তারা এই দায়িত্ব সফলভাবেই এখন পর্যন্ত পালন করে আসছেন, যার প্রমাণ লাস্ট ১৫ ম্যাচে ব্রাজিল অনলি ৩ গোল কন্সিড করে। একমাত্র স্ট্রাইকার নিয়ে খেলা দলগুলোর বিপক্ষে (জার্মানি, পোল্যান্ড) গোমেজ, সান্দ্রো ওয়্যাগনার, লেওয়ান্ডোস্কিকে টার্গেট করে আসা সব ক্রস ক্লিয়ার করার দায়িত্ব এরিয়াল ডুয়াল স্পেশালিস্ট সিলভাই পালন করেছে।

সিলভা এক্ষেত্রে দুইটা জিনিস হিসাব করে, স্ট্রাইকারস মুভ আর ক্রসের ট্র্যাজেক্টরি, যখন ক্রস ট্র্যাজেক্টরি তার অনুকূলে থাকে না, তখন সিলভা স্ট্রাইকারকে ডিস্টার্ব করে তাকে ফোর্স করে অফটার্গেট হেডে, নাহলে সে নিজেই এগিয়ে এসে ক্রস ক্লিয়ার করে। সিলভা ইনসাইড বক্সে এতটাই কম্ফোর্টেবল আর কনফিডেন্ট যে সে বল ক্লিয়ার করতে পারলে গোলকিপারের জন্যও বসে থাকে না। ডিফেন্ডিংয়ের সময় সিলভার ন্যাচারাল টেন্ডেন্সি হল স্টেপ ব্যাক করে ডেপথ কাভার করা, আর অপেক্ষা করা সামনে বল নিয়ে আসা প্লেয়ারকে অন্য কেউ রান মেক করে বাঁধা দেয়ার, সে ব্যর্থ হলে স্টেপ ব্যাক করে সিলভা পজিশন নিয়ে এরপর বল রিকভার করে। মিরান্ডাও সেইম স্টেপ ব্যাক করে ডেপথ কাভার করে, কিন্তু বক্সের ভিতর সে সিলভার তুলনায় কম ক্লিয়ার করে। এখানে একটা সেইম প্যাটার্ন মেইনটেইন করায় ইন্ডিভিজুয়াল ব্রিলিয়ান্ট কেউ চাইলে এর সুবিধা হয়তো নিয়েও নিতে পারে।

লং বল ডিফেন্সের সময় সিলভা, মিরান্ডার যে কোনো একজন অপনেন্টের একজনের সাথে ডুয়াল ডিফেন্ড করে, অন্যজন ডেপথ কাভার করে। দুইজনই কেয়ারফুল, দরকার না হলে তারা ডিফেন্ড করতে খুব বেশি উপরে উঠে আসে না। অপোনেন্টের ট্রাঞ্জিশনের সময় ক্যাসেমিরো সেটার দিকে খেয়াল রাখে, অকেশনালি সিলভা, মিরান্ডা তখন স্টেপআউট করে, প্লেয়ার চেজ করে, বাট অনলি ট্রাঞ্জিশনের টাইমে।

তিতের ব্রাজিল শর্ট বিল্ড আপে খেলে, পজিশন ধরে রেখে খেলতে চায়। কিন্তু দুই সেন্টারব্যাক কখনোই অন দ্য বলে হেল্প করে না, এই ব্রাজিলের এটা বিল্ডআপের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় উইকনেস, আর এটা প্রায় প্রতি ম্যাচেই অপোনেন্ট রেগুলারলি অ্যাডভান্টেজ নিচ্ছে। সিলভা, মিরান্ডা কেউই ফরোয়ার্ডে গিয়ে টিমমেটদের জন্য স্পেস ক্রিয়েট করতে কোনো সাহায্যই করে না! খুবই দৃষ্টিকটুভাবে দুই সেন্টারব্যাক একে অপরের থেকে ডিসকানেক্টেড হয়ে থাকে এবং মোস্ট অফ দ্য টাইম প্রতিপক্ষের প্রেসের স্বীকার হচ্ছে এমন কাউকে পাস দেয়, প্রায়ই এটা ডেঞ্জারাস সিচুয়েশন ক্রিয়েট করে।

আগেই বলা দানিলো প্রেসিংকে ভাল মত ডিল করতে পারে না, ইভেন মার্সেলোও সাপোর্টের অভাবে ভুল পাস দেয় অথবা বল হারায়, ফলশ্রুতিতে উইয়ার্ড অ্যাকশনের সৃষ্টি হয়। এই জায়গাতে প্রতিবার অপোনেন্ট ইজিলি বল রিকভার করে, তিতের উচিত এর সল্যুশন বের করা নাহলে বিশ্বকাপে এই একটা ফল্টেই ম্যাচ হেরে যেতে পারে ব্রাজিল।

যখন কোনো টিম শর্ট খেলে তখন একটা পয়েন্টে এসে ডিফেন্ডারকে বল ফরোয়ার্ডে নিয়ে এসে টিমমেটদের জন্য স্পেস ক্রিয়েট করতে হয়, তানাহলে বিল্ডআপ শুরুতেই নষ্ট হয়। সেন্টারব্যাকরা বল ফরোয়ার্ডে নিয়ে না আসলেও যখন সামনে থাকা অপনেন্টের পাশাপাশি দুইজনের মাঝে একটু গ্যাপ তৈরি হয়, তখন তারা ওই পাস লেনের মধ্য দিয়ে বল ফরোয়ার্ড পাস করে। এটা ভাল হলেও প্রতিবারই সেইম প্যাটার্ন মেইনটেইন করায় প্রতিপক্ষের ভাল কোচ হলে এটাকে ট্র্যাপ হিসেবে ইউজ করতেই পারে, ওই দুইজন স্পিডি আর ভাল ওয়ার্করেট ওয়ালা হলে ইন্টেনশনালিই গ্যাপ তৈরি করতে বলে সেটাকে চেজ করে অ্যাটাক করার ভাল উপায় এটা।

সিলভা, মিরান্ডার এরকম লিমিটেশন থাকার পরেও যখন দরকার হয় দুইজনেরই লং বল খেলার অ্যাবিলিটি আছে। ইন্টারে মিলানে খেলা অবস্থায় মিরান্ডা পার ম্যাচে ৩.৯টা লং বল প্রোভাইড করে, সিলভার পিএসজিতে করে পার ম্যাচ ৪.১ টা। অন দ্য বলে ব্রাজিল গোলকিপার অ্যালিসনও সাবলীল। অ্যালিসন তার কাছে বল থাকা অবস্থায় প্যানিক না হয়ে নিজেই অপনেন্ট প্লেয়ারকে প্রেশার করতে ইনভাইট করে যাতে তাদের পিছনে স্পেস ক্রিয়েট হয়, পাসিং অ্যাবিলিটি ভাল হওয়ায় সহজে সে স্পেস ইউজ করতে পারে।

মূল টুর্নামেন্ট শুরু হওয়ার আগে শুধু এক সিলভাকে দিয়ে ক্রস ক্লিয়ার করার রিস্ক নিবে নাকি অন্য কোনো উপায় বের করবে, শর্ট বিল্ডআপের সময় সেন্টারব্যাকরা কি ফরোয়ার্ডে বল নিয়ে এসে টিমমেন্টদের জন্য স্পেস ক্রিয়েট করবে নাকি পটেনশিয়াল প্রেসিং এর আন্ডারে থাকা প্লেয়ারকে বল পাস দিবে, সাথে মার্সেলোকে প্রায়ই বিট করে তার পেছনের প্লেয়ারের কাছে পাস চলে যাওয়া বল থেকে কিভাবে অ্যাটাক রোধ করবে, এ নিয়ে ভালই কাজ করার আছে তিতের জন্য। এখন সে কিভাবে এগুলো ফিক্স করে সেটাই দেখার বিষয়।

আরো পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *