Saturday, 26 May 2018

আন্দ্রেস এস্কোবার– ফুটবলের এক ট্র্যাজিক গল্প

১৯৯৪ বিশ্বকাপ। আমেরিকায় আসর বসে ফুটবলের।রেকর্ড সংখ্যক দর্শকে ভরপুর ছিল প্রতিটি ম্যাচ। উত্তেজনা, আবেগ, শংকা, অনিশ্চয়তা এসব নিয়েই আয়োজন করা হয় ‘৯৪ এর বিশ্বকাপ। জন্ম দেয় ফুটবলের এক অন্ধকারাচ্ছন্ন গল্পেরও। মাঝে মাঝে ফুটবল আপনাকে আনন্দ দিবে, সুখে কাঁদাবে, শোকে পাথর করবে, তাই বলে জীবনও কেড়ে নিবে?

হ্যা, এমনই এক গল্প অভিশাপ স্বরূপ হিসেবে এসেছিল আমেরিকা বিশ্বকাপে, ফুটবলের আপন মহিমাকে কালো অধ্যায়ে গ্রাস করে রেখেছিল।

বিশ্বকাপ বাছাই পর্বে আর্জেন্টিনা, পেরু, প্যারাগুয়েকে হারিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হিসেবেই আমেরিকায় পা রাখে ভালদেরামার কলম্বিয়া। ঐ বিশ্বকাপে কলম্বিয়াকে অনেকেই ৩য়, ৪র্থ ফেবারিট মনে করতেন। যারা বাছাই পর্বে অপরাজিত হয়েই বিশ্বকাপ খেলতে এসেছে, তাদের ফেভারিট না ধরলে অজ্ঞতারই তো পরিচয় দেবার কথা। তার উপর দলে ছিল লোজানো, ভ্যালেন্সিয়া, ভালদেরামার মতো উচুঁ মানের খেলোয়াড়।

বিশ্বকাপে নিজেদের ১ম ম্যাচে রোমানিয়ার কাছে অপ্রত্যাশিতভাবে ৩-১ গোলে হেরে যায় কলম্বিয়ানরা। স্বাভাবিকভাবেই নক আউট পর্বে যাওয়ার জন্য চাপ বেড়ে যায় এই ল্যাটিন দলের। তার উপর ২য় ম্যাচ স্বাগতিক যুক্তরাস্ট্রের বিপক্ষে। চাপটা তাই পাহাড় সমানও বলা চলে।

২২ জুন, ১৯৯৪ সাল। ৯৩,৬৮৯ জন দর্শকের সামনে পাসাডেনার রোজ বাউল স্টেডিয়ামে আমেরিকার বিপক্ষে নিজেদের ২য় ম্যাচে খেলতে নামে কলম্বিয়া। জয়ের বিকল্প নেই পরবর্তী রাউন্ডে যাওয়ার জন্য। এমন সমীকরণ মাথায় নিয়ে, প্রতিকূল পরিবেশে ম্যাচ শুরু করে ফ্রান্সিসকো মাতুরানার শিষ্যরা।

ম্যাচ শুরু হওয়ার ৩৫ মিনিটের মাথায় আত্মঘাতী গোল করে বসেন আন্দ্রেস এস্কোবার।এই গোলটিই তার জীবন কেড়ে নেয়ার জন্য যথেষ্ঠ ছিল। পুরো ক্যারিয়ারে তার এই একটি আত্মঘাতী গোলই ছিল। বিধিবাম, এটাই তৈরি করে দিলো এক অমর ট্র্যাজিক গল্পের।

আমেরিকা ২-১ এ ম্যাচটি জিতে নেয়। নক আউটে যাওয়ার স্বাদও ত্যাগ করতে হয় কলম্বিয়াকে। নিয়মরক্ষার শেষ ম্যাচে সুইজারল্যান্ডকে ২-০ গোলে হারিয়ে স্বান্তনার জয়টুকু পায় কলম্বিয়া। বলা যেতে পারে অমর এস্কোবার তার জীবনের শেষ ম্যাচে জয় নিয়েই ওপারে গিয়েছিলেন।

দেশে ফিরে যায় কলম্বিয়া ফুটবল দল। সাথে একরাশ হতাশা, দেশের মানুষের স্বপ্ন পূরণ না করার এক ব্যর্থতা। ২ জুলাই, ১৯৯৪। ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম কালো একদিন। বিকেল ৩টা ১২ মিনিটে, নিজ শহর মেদেলিনে গাড়িতে যাচ্ছিলেন আন্দ্রেস এস্কোবার। একদল মাফিয়া তার গাড়ি উদ্দেশ্য করে ২১টি গুলি ছুঁড়ে। প্রাণ ত্যাগ করেন এস্কোবার। পুরো কলম্বিয়া যেন মিনিটের মাথায় স্তব্ধ হয়ে যায়। ফুটবল বিশ্বে ওঠে শোকের মাতম।

একদল মাফিয়া যারা বেটিং এর মাধ্যমে ব্যবসা করতো তাদের হাতেই জীবন নাশ হয় এস্কোবারের। মাফিয়া ডন সান্টিয়াগো গ্যালেন জানায় তাদের ৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ক্ষতি হয় এস্কোবারের ওই একটি আত্মঘাতী গোলের জন্য। গ্যালেনের গাড়ির ড্রাইভার হামবার্তো কাস্ত্রো মুনোজ পরের দিন সকালেই গ্রেপ্তার হন। তাকে ৪৩ বছরের কারাদন্ড দেয়া হয় গ্যালেনের সাথে। পরে অবশ্য ১১ বছর পরই দু জন ছাড়া পায়।

বিশ্বকাপের হতাশা ভূলে পুরো কলম্বিয়া এখন এস্কোবার-শোকে মাতম। যে খেলোয়াড়টি ছিল পুরো স্কোয়াডের সবচেয়ে ভদ্র খেলোয়াড়, তার একটি আত্মঘাতী গোলেই তাকে ইহজগত ত্যাগ করতে বাধ্য করলো – এটা যেন পুরো কলম্বিয়ানবাসী মেনেই নিতে পারছেন না। এস্কোবারের মৃত্যুর খবর শুনে সেই আত্মঘাতী গোলের ম্যাচের রেফারী ইতালির ফাবিও বালদাস পর্যন্ত রেফারী ক্যারিয়ারের ইতি টানেন। হয়তোবা তার হৃদয়কেও নাড়া দিয়ে উঠেছিল এমন ট্র্যাজেডি।

পুরো কলম্বিয়া যেন কিছুদিনের জন্য অচল হয়ে গেল। ৩, ৪, ৫ জুলাই রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষনা করা হলো। দলে দলে সবাই এস্কোবারের শেষকৃত্যে শ্রদ্ধা প্রদর্শন করলো। পুরো কলম্বিয়া জুড়ে একটাই কথা “এস্কোবার,আমরা তোমাকে ভূলবো না। তুমি আমাদের হিরো”।

শোকে পাথর হয়ে কলম্বিয়ান তারকা খেলোয়াড় ভালদেরামা, এ্যাসপিরালা জাতীয় দল থেকে অবসর নিয়ে নেন!  ফলশ্রুতিতে ২০১৪ বিশ্বকাপের আগ পর্যন্ত পরপর ৪ বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতাই অর্জন করতে পারে নি কলম্বিয়া।

মেদেলিনের রোসালেসে এস্কোবারের সম্মানার্থে তৈরি করা হয় তার ভাস্কর্য। মাত্র ২৭ বছর বয়সে শেষ নিঃশেষ ত্যাগ করা এস্কোবারকে কলম্বিয়া তথা পুরো ফুটবল বিশ্ব কখনোই ভূলতে পারবে না। জীবনের শেষ গোলটি জীবনকে নিয়ে গেলেন ওপারের স্বাদ দিতে। ২ জুলাই তাই কলম্বিয়ার শোক দিবসের আওতায় আনা হয়, সেই সাথে সরকারি ছুটিও এই কালো-অভিশাপযুক্ত দিনটিতে। এস্কোবার, এস্কোবার, এস্কোবার-এক অমর ট্র্যাজিক গল্পের অধ্যায়!!

Escobar-We never forget u!
Football will never forget u!

আরো পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *