Saturday, 21 Apr 2018

ক্ল্যাশ অফ টাইটানসঃ জার্মানি ১-১ স্পেন! ম্যাচ এনালাইসিস!

গত শুক্রবার রাতটা ছিল দীর্ঘ ৪ মাস পর ইন্টারন্যাশনাল ফুটবলের প্রত্যাবর্তনের ম্যাচ! বিশ্বকাপে সুযোগ পাওয়া ৩২ দল যেমন নিজেদের ঝালাই করতে প্রীতি ম্যাচগুলিতে খেলতে নামে, তেমনি বিশ্বকাপে সুযোগ না পাওয়া নেদারল্যান্ডস-ইতালির মতো দলগুলিও নতুনভাবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে খেলতে নামে। বিশ্বকাপের পূর্বে নিজেদের ঝালিয়ে নেওয়া ম্যাচগুলির মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষনীয় এবং সবচেয়ে বেশি টানটান উত্তেজনার ম্যাচ ছিল দুই শিরোপা প্রত্যাশী এবং শেষ দুইবারের চ্যাম্পিয়ন স্পেন ও জার্মানি। জার্মানির এস্প্রিট এরেনেয় হওয়া ম্যাচটি ১-১ গোলে অমীমাংসিত থাকলেও দুই দলই নিজেদের সামর্থ্যের প্রমান দেয় ৯০ মিনিটের লড়াইয়ে!

বার্সেলোনার তিকিতাকাকে অনুসরন করে এবং এক ঝাঁক ট্যালেন্টেড ফুটবলারকে সঙ্গী করে ২০০৮-১৩ সময়টা শাসন করে স্প্যানিশরা। এসময়টায় প্রথমবারের মতো বিশ্বজয় সহ ব্যাক টু ব্যাক ইউরো জিতে লা রোজারা এবং কনফেডারেশন কাপে রানার্স আপ হয়। জাভি, আলোন্সো, পুয়োল, ক্যাসিয়াসদের মতো কিংবদন্তীদের পড়তি ফর্ম এবং অবসরের কারণে মাঝখানের দুটি বড় আসরে হতাশাজনক পারফর্মেন্স দেখালেও ইস্কো, ডি গিয়াদের মতো নতুন তারকাদের সাথে ইনিয়েস্তা, সিলভা, রামোস, পিকেদের মতো অভিজ্ঞদের মিশেলে স্পেন আবারো বিশ্বমঞ্চে নিজেদের সামর্থ্যের জানান দিচ্ছে। দলে বার্সেলোনা প্লেয়ারদের আধিপত্য কমলেও সেই ছোট ছোট পাস নির্ভর তিকিতাকার সাথে দুর্দান্ত গতি স্পেন ২০১৮ বিশ্বকাপের অনেক বড় দাবিদার।

১৯৯৮-২০০৪ এর হতাশাজনক অধ্যায় পার করে, ট্যালেন্ট ডেভেলাপমেন্ট পোগ্রামের কল্যানে এবং ইয়ুর্গেন ক্লিন্সম্যান, জোয়াকিম লোর মতো কোচের হাত ধরে জার্মানি এখন বিশ্বের সেরা ৩ দলের একটি, যারা শেষ ৩ বছরে দুটি মেজর টূর্নামেন্ট জিতেছে, যার একটি আবার তারুণ্য নির্ভর দল নিয়ে। এই জার্মানি আগেকার মতো শারীরিক শক্তি নির্ভর, লং বল, কাউন্টার এটাক নির্ভর জার্মানি না। বরং পায়ে বল রেখে কুইক শর্ট পাসিং এর সাথে চিরাচরিত গতি নির্ভর। এই জার্মানি অতীতের যেকোন সময়ের তুলনায় অনেক ভার্সেটাইল এবং ট্যালেন্টেড।

এস্প্রিট এরেনার ম্যাচটিতে দুই দলই দুই-একজন মূল প্লেয়ার বাদে পূর্ন শক্তির দল নিয়েই নামে। দুই দলেরই স্টার্টিং লাইনাপ ছিল ৪-৩-৩। স্পেনের গোলপোস্টে ইউনাইটেডের ডি গিয়া আর জার্মানির পোস্টে বার্সেলোনার টার স্টেগান। কার্ভাহাল, রামোস, পিকে, আলবার ব্যাকলাইনের বিপরীতে কিমিচ, হুমেলস, বোয়েটাং, হেক্টরকে নিয়ে জার্মানির ব্যাকলাইন। স্পেনের মিডফিল্ডে ইনিয়েস্তার সাথে থিয়াগো-কোকের হোল্ডিং মিড জুটি, অপরদিকে জার্মানিতে অজিলের পিছনে ক্রুস-খেদিরা ডুয়ো। স্পেনের ফ্রন্ট লাইন ইস্কো-রড্রিগো-সিলভা, জার্মানির ফ্রন্ট লাইন ড্রাক্সলার-ওয়ার্নার-মুলার।

কাগজে কলমে স্পেনের ফর্মেশন ৪-৩-৩ আর ইস্কোর পজিশন লেফট উইঙ্গার হলেও, রিয়াল মাদ্রিদের মতোন এ ম্যাচেও ইস্কো ছিল ফলস উইঙ্গার ওর ট্রেকোয়ার্তিস্তা রোলে, যে কিনা লেফট-রাইট-সেন্টার সবখানে ফ্রী মুভ করছিল। ফ্রী রোলের ইস্কোকে ধরলে স্পেনের অন ফিল্ড ফর্মেশন ছিল ৪-৩-১-২। আবার থিয়াগো-কোকে স্পেনের ডিফেন্স লাইনের সামনেই বেশিরভাগ টাইম পজিশন নিয়ে থাকার স্পেনের ফর্মেশনকে ৪-২-৩-১ ও বলা যায়। স্পেন এটাকিংলিও যেমন ৪-২-৩-১ ছিল, ডিফেন্সিভলিও ৪-২-৩-১ এ ডিফেন্স করে গেছে। বল পজেশন থাকা অবস্থায় স্পেনের ফ্রন্ট ফোরের সবাই মোটামুটি ফ্রী রোলে ছিল। ইস্কো যেমন ফ্রী, নাম্বার রড্রিগোও সেন্টার পজিশন ছেড়ে একবার লেফটে আরেকবার রাইটে এভাবে রোমিং করছিলেন। ফ্রন্ট ফোরের ৪ জন পজিশন সোয়াপ করে জার্মান ডিফেন্স লাইন ব্রেক করার চেষ্টায় ছিলেন।

অপরদিকে ৪-৩-৩ এর জার্মানি ফার্স্ট হাফে ৪-৪-২ এ ডিফেন্স করলেও সেকেন্ড হাফে কখনো ৪-৩-৩ শেইপে আবার কখনো ৪-২-৩-১ শেইপে ডিফেন্স করে গেছে।

একটা ম্যাচ আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণ নির্ভর হয় কখন? – যখন দুই দলই এটাকিং এপ্রোচে খেলে। এটাকিং ফুটবল খেলা মানে অনেকের কাছে সিংহভাগ প্লেয়ার একই সাথে অপোনেন্ট হাফে উঠে যাওয়া। তবে মডার্ন ফুটবলে ট্যাক্টিক্যালি এটাকিং ফুটবল খেলার ৩ টা মেজর ক্যারেক্টার হচ্ছে –

১. হাইলাইন ডিফেন্স

২. হাইপ্রেসিং উইথ এগ্রেসিভনেস

৩. হার্ড কাউণ্টার প্রেসিং

বর্তমান কালের এটাকিং ফুটবল খেলা দলগুলি এই ক্যারেক্টারিস্টিক গুলা শো করবেই। এবং যখন দুইটা টপ ক্লাস টিম, যাদের দলে একই সাথে বেশ কয়েকজন টপ ক্লাস ট্যালেন্টেড প্লেয়ার উপস্থিত – সেই দুই দল যখন এই ৩ টা ট্যাক্টিক্স ফলো করে তখন সেই খেলাটা আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণের উপভোগ্য এক ম্যাচ না হয়ে পারেই না!

স্পেন-জার্মানি দুদলই এই ৩ টা ট্যাক্টিক্স এপ্লাই করে এটাকিং এপ্রোচে খেলে গেছে পুরো ম্যাচ। স্পেনের তুলনায় জার্মানির ডিফেন্স লাইন বেশি হাই ছিল, স্পেন যাতে তাদের ট্রায়াঙ্গুলার শর্ট পাসিং ফুটবল খেলতে না পারে আর বল যাতে হাফলাইনের কাছাকাছি উইন করে দ্রুতই স্পেনের বক্সে আঘাত হানা যায় এটিই ছিল উদ্দেশ্য। অপরদিকে ভার্সেটাইল জার্মানি লং বল, কাউন্টার এটাক, উইং প্লে তেও ডেঞ্জারাস হতে পারে – সেই বিবেচনায় স্পেনের ডিফেন্স লাইন হাই থাকলেও জার্মানির তুলনায় ডীপ ছিল।

দুই দলই একে অপরকে প্রতিপক্ষের হাফে, বক্সের কাছে হাইপ্রেসিং করে গেছে। দুদলই বেশিরভাগ সময় ম্যান অরিয়েন্টেড হাইপ্রেসিং এপ্লাই করে, বাট গোল খাওয়ার পর কিছু সময় জার্মানি আরো এগ্রেসিভ বল অরিয়েন্টেড জোনাল হাইপ্রেসিং এপ্লাই করে স্পেনের উপর। হোল্ডিং মিড করা মার্কিং এ থাকলে ওর সেন্টার এরিয়ায় শ্যাডো প্রেসিং করে দুদলই প্রতিপক্ষকে সাইডে বল খেলতে প্রলুদ্ধ করে, এবং বল সাইডে খেলা হলেই প্রেসিং ইন্টেন্সিটি বাড়িয়ে দিচ্ছিল। তবে জার্মানি প্রথম গোলটা খায় নিজেদের হাফে এই সাইড প্রেসিং করতে যেয়ে – লেফট উইঙ্গে স্পেনকে আটকে ফেললেও সেন্টারে ফ্রী থাকা ইনিয়েস্তার কাছে ঠিকি বল পৌছে দেয় বার্সা টীমমেট জর্দি আলবা। ম্যাজিশিয়ান ইনিয়েস্তার ম্যাজিক দেখাতে অতোটুকু স্পেসই যথেষ্ট ছিল। নিজেদের হাফে স্পেনকে সাইডে প্রেস করতে গিয়ে ব্যাকলাইনে স্পেস ছেড়ে রাখে জার্মানি, ম্যাট হুমেলসের পিছন দিয়ে ইনিয়েস্তার পাস থেকে সেই স্পেসটা কাজে লাগান রড্রিগো স্টেগানকে পরাস্থ করে।

ম্যাচের ৩৫ মিনিটে বক্সের বাইরে দুর্দান্ত এক লং রেঞ্জ শটে যেই গোলের শোধ এনে দেন থমাস মুলার।

হাইলাইন ডিফেন্স যেমন খুব দ্রুত কম স্পেস কভার করে অপোনেন্ট বক্সে যেতে সাহায্য করে তেমনি হাইপ্রেসিং এবং এগ্রেসিভ কাউন্টার প্রেসিং ও আরো ভালোভাবে, আরো কম সময়ে কম স্পেস কভার করে গোল স্কোরিং চান্স ক্রিয়েট করতে সাহায্য করে। স্পেন-জার্মানি দুই দলই হাইপ্রেসিং এবং এগ্রেসিভ কাউন্টার প্রেসিং দিয়ে বেশ কয়েকবারেই ভালো কিছু চান্স ক্রিয়েট করে। তিকিতাকা, এবং শর্ট পাস নির্ভর ফুটবলে কাউন্টার প্রেসিং বেশি ইফেক্টিভ হয় – স্পেন তাই আরো আগে থেকেই কাউন্টার প্রেসিং এ দুর্দান্ত। লং বল নির্ভর ফুটবলে কাউন্টার প্রেসিং কম ইফেক্টিভ, কারন বল হারালে বলের আশেপাশে কাউন্টার প্রেস করার মতো টিমমেট থাকে কম। তবে বদলে যাওয়া জার্মানি এখন আর শুধু লং বলে খেলে না, শর্ট পাসেও খেলে – তাই জার্মানিও কাউন্টার প্রেসে দারুন ছিল এ ম্যাচে। বাট কাউন্টার প্রেসিং বিচার করলে স্পেন এগিয়ে ছিল।

হাইপ্রেসিং, এগ্রেসিভ প্রেসিং, কাউন্টার প্রেসিং একি সাথে যেমন এক্সট্রা এটাকিং এডভান্টেজ দেয়, তেমনি একটু ভুলেই আরো বড় মাসুল দেয়। হাইপ্রেসিং, কাউন্টার প্রেসিং এর ভুল কাজে লাগিয়ে দুইদলই বেশ কিছু ভালো আক্রমন করে। তবে এই সুযোগ গুলা কাজে বেশি কাজে লাগাতে পারসে জার্মানি – তাদের সেই চিরচেনা লং বল, কুইক কাউন্টার এটাক মেথডে!

দুই দলের এটাক বিল্ড আপ আর ফাইনালাইজেশনে আরেকটা ইম্পোর্ট্যান্ট ট্যাক্টিক্স ছিল বিট্যুইন দ্যা লাইনের স্পেস এক্সপ্লয়েট করা। ওভার ট্যা টপ লং বল খেলা ওর উইং ধরে এগোনোর চেয়ে বিট্যুইন দ্যা লাইনে প্লেয়ার রেখে তাকে বল খেলিয়ে এটাক ফাইনালাইজেশনে মনোযোগ ছিল বেশি। ৪-২-৩-১ এর স্পেনের ফ্রন্ট ফোরের অন্তত ২ জন সবসময় বিট্যুইন দ্যা লাইনে ছিলেনই। ৪-২-৩-১ শেইপে ডিফেন্ড করলেও মাঝেমধ্যে এও দেখা গেছে একসাথে ৩-৪ জন জার্মান স্পেনের লাস্ট লাইন অফ ডিফেন্সের বদলে বিট্যুইন দ্যা লাইনে পজিশন নিয়ে আছে, এবং তাদের মাঝে অবশ্যই মেসুত অজিল অন্যতম।

এটাকিং থার্ডে গিয়ে দুদলই চেষ্টা করেছে বিট্যুইন দ্যা লাইনে বল খেলতে, এই বিট্যুইন দ্যা লাইনে বল খেলার ফলে প্রায়ই দুদলের ডিফেন্স লাইন স্ট্রেইট শেইপ হারাচ্ছিল আর গ্যাপ ক্রিয়েট হচ্ছিল। উইং দিয়ে উঠুক কিংবা লাস্ট ম্যান স্ট্রাইকার বল রিসিভ করুক, বিট্যুইন দ্যা লাইনে বল খেলে অপোনেন্ট ডিফেন্স লাইন ব্রেক করার চেষ্টা ছিলই। বিট্যুইন দ্যা লাইনে অজিলের ক্রিয়েটিভিটি যেমন জার্মানির চান্স ক্রিয়েশনে মূল ভূমিকা রাখছিল, অপরদিকে স্পেন এটাকিং থার্ডে গেলে যেন সেই কুইক শর্ট পাসের শৈল্পিক তিকিতকার প্রদর্শনীতে মেতে উঠছিল। জার্মান বক্সে ৩-৪ টা কুইক পাস খেলে জার্মানদের বিভ্রান্ত করে সবচেয়ে সুবিধাজনক পজিশনে স্পেস সহ থাকা প্লেয়ারকে দিয়ে গোল করানোর চেষ্টা ছিল স্পেনের।

১-১ এ শেষ হওয়া ফার্স্ট হাফের পর সেকেন্ড হাফে আর কোন গোল হয় নি। দুই হট ফেভারিটের লড়াইয়েও তাই পরিষ্কারভাবে কেউ সেভাবে এগিয়ে নেই। নেহাত প্রীতি ম্যাচ বলে হয়তোবা দু’দলই এটাকিং এপ্রোচে খেলে উপভোগ্য এক ম্যাচ উপহার দিয়েছে, কিন্তু বিশ্বকাপের ডু ওর ডাই ম্যাচে দুদলের ট্যাক্টিক্সে কিছু ভিন্নতা আসবে আশা করা যায়। তবে দুদলই যে রাশিয়া বিশ্বকাপের বড় দাবিদার তার প্রমাণ এস্প্রিট এরেনার এই ম্যাচ!

আরো পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *