Saturday, 21 Apr 2018

টোটাল ফুটবলের ইতিহাস

This is a system that a attacker can play as a defender, a defender can play as a attacker. everyone can play everywhere – JOHAN CRUYFF

টোটাল ফুটবল সম্পর্কে বলতে গিয়ে ক্রুইফ এ কথা একবার বলেছিলেন। টোটাল ফুটবল, ফুটবল মাঠে রাজত্ব করা কিছু ট্যাক্টিকস এর একটি নিঃসন্দেহে। এ টোটাল ফুটবলই ৬০ দশকে রাজত্ব করা ক্যাতেনেচ্চিওর উপর রাজত্ব করতে সক্ষম হয়েছিলো। এ টোটাল ফুটবলকে পরিমার্জিত করেই ৯০ এর দশকে ক্রুইফ গড়েছিলেন বার্সার স্বপ্নের একাদশ। এ টোটাল ফুটবলের প্রিন্সিপাল ফলো করেই বার্সা হয়ে গিয়েছিলো এলিয়েনদের দল। কি এই টোটাল ফুটবল স্ট্রাটেজি? সোজা ভাষায় একটা ক্লকওয়ার্থি সিস্টেম। এ সিস্টেমে কোন খেলোয়াড়ের স্পেসেফিক কোন পজিশন নেই। সিস্টেমেটিক্যালি যাকে যখন যেখানে খেলতে হয়। নাগরদোলা দেখেছেন! নাগরদোলার দোলনাগুলো প্রতিনিয়ত একটি কেন্দ্রের উপর ভর করে ঘুরতে থাকে। একটি দোলনা কখনও একদম উপরে থাকলে আবার পরক্ষনেই একদম নিচে ।

ঠিক টোটাল ফুটবলও ওভাবে কাজ করে। আর এ ট্যাক্টিকসে একজন মিডফিল্ডারকে কেন্দ্র করেই অফেন্স এবং ডিফেন্সের খেলোয়াড়রা অর্ডিনেট হতে থাকে। ৭০এর দশকে ইয়োহান ক্রুইফ ছিলো নেদারল্যান্ড দলের ফরোয়ার্ড এবং মোস্ট স্কিল ফুল প্লেয়ার। সিস্টেমের ডিমান্ডে তাকে ডিপে নেমে খেলতে হত এবং মূলত সে তার সতীর্থদের বলতে পারত, কার থেকে কখন কোথায় যেতে হবে! টোটাল ফুটবল হল ছোট ছোট কন্টিনিয়াস পাসিং আর প্রতিনিয়ত স্পেস এর খোজ করা। প্রতিপক্ষকে কনফিউস করা প্লেয়ারের পজিশন নিয়ে মূলত এটাই কাজ। আর এ ট্যাক্টিকসে মূলত বেশিরভাগ সময়টাতেই প্লেয়াররা অপোজিশন হাফে থাকে। যাতে প্লেয়ারদের অর্ডিনেট করতে সুবিধা হয়। এভাবে একটা সেট বরাবর বারবার বল এক্সচেন্জ করে স্পেস খুজে ফাইনাল বলটি দেয়া। আর এক্ষেত্রে প্রতিটি খেলোয়াড়কে সমান পজিশনিং সেন্স এর সহিত খেলতে হয়। বল মুভমেন্ট করতে করতে সেট বাই সেট খেলতে কিছু প্লেয়ার স্কোরিং পজিশনে সেট হয়ে যায় এবং ফাইনাল পাসটি তখন আসে ।

এ খেলার ডিফেন্সিভ স্ট্যাটেজি হল, পাসিং লাইন ন্যারো করা, কন্টিনিয়াস প্রেসিং, পাস ইন্টারসেপ্ট করা। আর ডেডলি খেলোয়াড়দের মার্কিং এ রাখা। সবাইকে মূলত মার্কিং এ না রেখে দুইজন খেলোয়াড়ের মাঝখানে পাসিং লাইন ব্লক করা। আর এ ক্ষেত্রে ডিফেন্সিভলি খেলোয়াড়েরা একটা ইউনিট হিসেবে কাজ করে। এবার আসি কেনো এ পজিশন চেন্জিং? এটা জানতে হলে ফিরে যেতে হবে একটু পিছনে। ৬০ দশকে হাইপার ডিফেন্সিভ স্ট্র্যাটেজি ক্যাতেনেচ্চিও ক্যালসিওতে হেভি ম্যান মার্কিং করে ফুটবল বিশ্বে এক প্রকার রাজত্ব করছিলো। এ পদ্ধতির কাউন্টার হিসেবে এ টোটাল ফুটবল। দ্রুত পজিশন চেন্জ করে ম্যান মার্কিং এ কনফিউজ সৃষ্টি করার জন্যই মূলত এ পদ্বতি। এত টাইট ম্যান মার্কিং এর ফলে গোল করা, বল নিয়ে কিছু করা কঠিন হয়ে যেত। ৭০ এ কোচ রাইনাস মিশেল আয়াক্সের প্লেয়ারদের পজিশন চেঞ্জ করে ইন্টারকে পরাজিত করে । এ পজিশন চেঞ্জিং ম্যান মার্কারদের অসুবিধার সৃষ্টি করতো। যখন তারা প্লেয়ারদের মার্কিং করার জন্য তাদের পিছন পিছন ছুটতো, তখন তারা তাদেরকে ভূল পজিশনে দেখতে পেতো। যার ফলে ম্যান মার্কিংই কাল হয়ে দাড়াত।

যার ফলে অনেক স্পেস সৃষ্টি হত। আর স্কোরিং চান্স ক্রিয়েট হত। এর ফলেই মূলত পজিশন চেন্জ করা হয় প্রতিনিয়ত। রাইনাস মিশেল তার দলের প্লেয়ারদেরকেই সেভাবে ট্রেইন করাতো যাতে তারা যেকোন পজিশনে মানিয়ে নিতে পারে। সবাই মনে করেন টোটাল ফুটবলের আবিষ্কারক ডাচরা, এবং এর শৈল্পিক পর্যায় রাইনাস মিশেল এবং ক্রুইফের হাত ধরে এসেছিলো। কিন্তু ১৯১০ এর দিকে ইংলিশ কোচ জিমি হুগান এ পদ্বতি শুরু করেন। তিনি দুটো বেসিক কনসেপ্টস এর উপর ভিত্তি করে ডাচ ক্লাব ডর্ডেক্টকে কোচিং করাতেন। এক হলো পাসিং দুই হলো প্রেসিং ও স্ট্যামিনা। পরবর্তীতে আরো ১৫ বছর পর জিমি হুগান এর পদ্বতি অনুসরন করেন আরেক ইংলিশ কোচ জ্যাক রেইনল্ডস। তিনি ১৯১৫ থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত আয়াক্সের কোচ ছিলেন। এসময়ে তিনি ফ্ল্যাংক দিয়ে ওয়াইড মিডফিল্ডার বা উইংগার খেলিয়ে টোটাল ফুটবলকে অন্য এক মাত্রায় যোগ করে।এ রেইনল্ডস এর আয়াক্সের মোস্ট ট্যালেন্টেড খেলোয়াড় ছিলো রাইনাস মিশেল, যে পরবর্তীতে আয়াক্স এবং ডাচদের কোচিং এর দায়িত্ব পালন করে। ম্যাজিক্যাল ম্যাগিয়ারস খ্যাত হাংগেরিয়ানরাও সেভেস এর হাত ধরেই টোটাল ফুটবল খেলে। আবার ৩০ এর দিকে অস্ট্রিয়া ন্যাশনাল টিম এ পদ্বতিতে খেলে। এ অস্ট্রিয়ান “WUNDERTEAM” খ্যাত দল এ পদ্বতিতে খেলে এ খ্যাতি অর্জন করে। ঐ দলের খেলোয়াড় আরনেস্ট হ্যাপেল

পরবর্তীতে EARLY 70তে নেদারল্যান্ডের কোচের দায়িত্ব পালন করে । ৬৫তে রাইনাস মিশেল পিউর টোটাল ফুটবল খেলানো শুরু করে আয়াক্সকে। এ আয়াক্সের খেলা জনপ্রিয় হয়ে উঠে ক্রুইফসহ আরো কিছু নন্দিত তারকার ফলে। এই টোটাল ফুটবল খেলেই ডাচরা ৩ বার পরপর ইউরোপিয়ান কাপ জিতে। ৭৪ এ মিশেলের ডাচ টিম বিশ্বকাপে অন্যতম ফেভারিট হিসেবে শুরু করে এবং প্রায় প্রতিটি ম্যাচে প্রতিপক্ষের উপর চড়াও হয়ে খেলে। এই সময় ডাচ টিমকে বলা হত “ক্লকওয়ার্ক অরেঞ্জ”। পরে অবশ্য ফাইনালে জার্মানির কাছে হেরে যায় তারা। ৭৮ এ আবারো বিশ্বকাপ ফাইনালে আর্জেন্টিনার কাছে হেরে যায়। বর্তমানে অবশ্য সে অর্থে টোটাল ফুটবল কেউ খেলে না। ৯০ দশকে টোটাল ফুটবলকে বেজ করেই বার্সা কোচ ক্রুইফ নতুন পদ্বতি আবিষ্কার করেন তা হল টিকিটাকা। এই টিকিটাকা দিয়ে বার্সা প্রথমবারের মত চ্যাম্পিয়নস লীগ জিতে।

বর্তমানে পিউর টোটাল ফুটবল আর দেখা যায় না। যার জন্য হিউজ স্ট্যামিনা এবং গ্রেট কোয়ালিটি থাকা দরকার, এ পদ্বতি এডাপ্ট করতে আর মডার্ন ট্যাকটিকাল জগতে এত এটাক ওরিয়েন্টেড স্ট্যাটেজি সুফল বয়ে আনবেনা নিয়মিত।

আরো পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *