Sunday, 24 Jun 2018

”ইয়ান রাশ” একজন কিংবদন্তী

সালটা ১৯৮০। মে মাসের ১ তারিখ। চেস্টার সিটি থেকে ৩ মিলিয়ন পাউন্ডের বিনিময়ে মার্সিসাইড রেডে যোগ দেয় ১৯ বছর বয়সী এক কিশোর। রাশশি নামেই যে সতীর্থদের কাছে পরিচিত ছিল।

মার্সিসাইড রেড অর্থাৎ লিভারপুল। সে সময়টাতে লিভারপুলের হাল এমন দুইজন মানুষের হাতে ছিল যাদের আজও পূজা করে অলরেড ফ্যানরা। কোচ হিসেবে ছিল লিভারপুলের সর্বকালের সেরা একজন কোচ বব পেইসলি আর টিমের ক্যাপ্টেন ছিল তৎকালীন টিমের কিং নামে খ্যাতি লাভ করা কেনি ডালগ্লিস। মূলত এ দুজনের পরশেই সতীর্থদের রাশশি লিজেন্ডদের কাতারে নাম খোদাই করা ইয়ান রাশে পরিণত হয়েছিল।

রাশ যখন লিভারপুল টিমে ঢুকেন তখন লিভারপুল সর্বেসর্বা না হলেও চ্যাম্পিয়ন টিম ছিল। এমন একটা টিমে হুট করে ঢুকেই ১৯ বছর বয়সী কোন কিশোর যে জায়গা করে নিতে পারবেনা তা স্বাভাবিক। রাশের বেলায়ও তার বিপরীত ঘটলনা। প্রথম তিন চার ম্যাচে মাঠেই নামা হয়নি তার। পরবর্তী চার ম্যাচ তার সামনে এগিয়ে যাওয়ার দরজা খুলে দেয়। টানা চার ম্যাচে সাবস্টিটিউট হিসেবে নেমে পাঁচ গোল করে গুরু বব পেইসলিকে এই কিশোর ভালমতই জানান দেয় যে আমি এবার মূল একাদশের জন্য প্রস্তুত। পেইসলিও তা ভালমতোই আমলে নেয়।

পরবর্তী ম্যাচ; প্রতিপক্ষ ইপসউইচ টাউন। বব পেইসলি লিজেন্ড ডালগ্লিসকে বেঞ্চড করে তার জায়গায় প্রথম একাদশে সুযোগ দেয় তখনকার ওয়ান্ডার কিড ইয়ান রাশকে।সেই যে শুরু আর কে থামায় প্রতিপক্ষের ডিফেন্স চূর্ণ বিচূর্ণ করা এই ত্রাসকে! সেই প্রথম মৌসুমেই ৪৯ ম্যাচে ৩০ গোল করলেন। জিতলেন সেই বছরের পিএফএ ইয়াং প্লেয়ার অফ দ্যা ইয়ার এবং সাথে পিএফএর সেইসময়কার লিজেন্ডদের বিট করেই লিভারপুলের জার্সি গায়ে প্রথম মৌসুমেই জিতে নিলেন পিএফএ প্লেয়ার অফ দ্যা ইয়ার।পরের এক মৌসুম গ্যাপ দিয়ে আবারও টানা দুবছর নিজের ঝুলিতে পিএফএ প্লেয়ার অফ দ্যা ইয়ারের মুকুটটি লুফে নেন। সাথে টানা তিনটা লিগের পাশাপাশি ১৯৮৩-৮৪ মৌসুমে চতুর্থ ইউরোপিয়ান ট্রফিটাও লিভারপুল ঘরে তোলে রাশ আর কিং ডালগ্লিসের অসাধারণ এই পার্টনারশিপে ভর করে। আবার ওই সিজনেই রাশ লিভারপুলের হয়ে একজন প্লেয়ারের পুরানা এক রেকর্ড ভেঙ্গে নিজের করে নেয় এক সিজনে লিভারপুলের জার্সি গায়ে ৪৭ গোল করে। ফলাফল হিসেবে ওই মৌসুমের ইউরোপিয়ান গোল্ডেন বুট রাশের পকেটে।

রাশের এমনসব পারফরমেন্স দেখে নাপোলি তাকে নিতে উঠেপড়ে লেগেছিল। রাশের চলে যাওয়াও মোটামোটি কনফার্ম হয়েই গিয়েছিল। একদম শেষ পর্যায়ে বাদ সাধে লিভারপুলের সেইসময়কার চেয়ারম্যান জন স্মিথ, রাশ লিভারপুলেই থাকে। বলে রাখা ভালো, রাশকে না পেয়েই নাপোলি তখন বার্সা থেকে সাইন করিয়ে নেয় দ্যা গ্রেটেস্ট প্লেয়ার ডিয়েগো ম্যারাডোনাকে।

১৯৮৬ সাল, ইতালিয়ান ক্লাব জুভেন্টাস রাশের জন্য সেই সময়কার বিশ্বরেকর্ড ৩.২ মিলিয়ন পাউন্ডের ট্রান্সফার ফির অফার দেয় লিভারপুলকে। এতবড় অফার গ্রাহ্য করার কোন সাধ্যই ছিল অলরেডদের। অগত্যা জুভেদের কাছে ছেড়ে দিতে হল ততদিনে চ্যাম্পিয়ন প্লেয়ার তকমা পাওয়া রাশকে। কিন্তু ট্রান্সফার হয়েও যেন হলনা। এক সিজন খেলেই ইউরোপিয়ান নিয়মের মারপ্যাঁচে জুভেন্টাস থেকে লোনে আবার দ্বিতীয়বারের মতো সেই চিরচেনা অলরেডদের ডেরাতেই হাজির রাশ। মাঠেও যেন সেই রাশ এসেই আবার ওই সিজনে প্রতিপক্ষের ডি বক্সে ত্রাস ছড়ালেন। করলেন ৪২ ম্যাচে ৩০ গোল।মৌসুম শেষ হলো লোনও শেষ হলো যত যাই হোক নিজেদের যখন না থাকে তখন তো যেতে দিতেই হয়। অলরেড ফ্যানরা অশ্রুশিক্ত বিদায় জানালো এই স্টারকে।

১৯৮৭-৮৮ মৌসুম, ইতালির জুভেন্টাসে পাড়ি জমালেন রাশ। ওল্ড লেডিরা প্লাতিনি যাওয়ার পর রাশকে ঘিরে স্বপ্ন বোনা শুরু করল। কিন্তু শুরু থেকেই কিছু হচ্ছিলো না। ইতালির প্লেয়িং স্টাইলের সাথে কোনভাবেই মানায়ে নিয়ে পারতেছিলনা রাশ। ফলাফল স্বরুপ সিজন শেষ হতেই তার বিকল্প খোঁজা শুরু করল জুভেন্টাস। আর সে সুযোগে ঝোপ বুঝে কোপ মারল লিভারপুল। আবারও সেই লিভারপুল। তার ভালবাসার ক্লাব। যেই ক্লাব তাকে আজকের রাশে পরিণত করছে এমন একটা মূহুর্তে সেই ক্লাবের অফার রিজেক্ট করার মতো শক্তি কি তার আছে? জুভেন্টাস বোর্ডকে রীতিমতো প্রেশার ক্রিয়েট করে আবারও তার ছোটবেলার সেই স্বপ্নের ক্লাব লিভারপুলে পাড়ি জমালেন।

১৯৮৮-৮৯ সিজন থেকে ১৯৯৫-৯৬ সিজন। এবার টানা ৮ বছর! লিভারপুলে ঠিক যেখানে শেষ করেছিলেন শুরু করলেন আবার সেখান থেকেই। গোলের পর গোল।লিভারপুলও জিততে থাকল একের পর এক ট্রফি। আর ইন্ডিভিজ্যুয়ালি ট্রফি তো তার ঝুলিতে প্রতি সিজনে দু একটা থাকতই। তার সময়েই লিভারপুল তাদের ১৮ তম এবং শেষবারের মতো লিগ ঘরে তুলে।১৯৯৬ এই লিভারপুলের রাশ লিভারপুলকে বিদায় জানায়। কান্নায় জর্জরিত অবস্থায় এনফিল্ড সেদিন এই কিংবদন্তীকে শেষবারের মতো বিদায় জানায়। পরে অন্যান্য ক্লাবের হয়ে খেললেও লিভারপুলের জার্সি গায়ে আর নামা হয়নি ইয়ান রাশের।

ইয়ান রাশ; কেবল লিভারপুলের বেস্ট নাম্বার ৯ না। ইংলিশ লিগে তো বটেই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কয়েকজন নাম্বার নাইনের মাঝে সে একজন। লিজেন্ডদের কাতারে বহু আগেই ইয়ান রাশ নামটা তারকাদ্যুতির ন্যায় উজ্জ্বল থাকবে। বহু লিজেন্ডারি স্ট্রাইকার তাঁকে আইডল মানে। তাকে ফলো করে। তার খেলার ধরণকে পূজা করে। একজন পিউর নাম্বার নাইনের সংজ্ঞা ইয়ান রাশ।

আরো পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *