Saturday, 21 Apr 2018

একান্ত সাক্ষাৎকারঃ কায়সার হামিদ

বাংলাদেশ ফুটবলের সোনালী সময়ের সেনানী, ফুটবল লিজেন্ড কায়সার হামিদ। তাঁর সময়ের,এমনকি বাংলাদেশ ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা ডিফেন্ডার তিনি। ফুটবল ম্যানিয়াক্স এর সাথে তিনি বসেছিলেন, দেশের ফুটবলের বর্তমান অবস্থান, উত্তরণের পথ, তাঁর পছন্দ অপছন্দ সবকিছু নিয়ে। আলাপচারিতায় চলে যাইঃ

ম্যানিয়াক্সঃ কেমন আছেন স্যার?

কায়সার হামিদঃ ভালো আছি , আলহামদুলিল্লাহ।

ম্যানিয়াক্সঃ আপনার ফুটবল জীবনের শুরুটা কিভাবে স্যার?

কায়সার হামিদঃ স্কুল থেকেই খেলতে খেলতে। স্কুলেই তো সব ধরনের খেলা খেলতাম, ফুটবল, ক্রিকেট। এথলেতিক্সে চ্যাম্পিয়ন ছিলাম, হাই জাম্প, লং জাম্প সবকিছুতে মেডেল নিতাম, স্কুল চ্যাম্পিয়ন ছিলাম। আদমজী ক্যান্টনমেন্ট স্কুলে ছিলাম।

ম্যানিয়াক্সঃ সেখান থেকে পেশাদার ফুটবলে কিভাবে অভিষেক?

কায়সার হামিদঃ পেশাদার ফুটবলে আসা বলতে, ৮২তে খেলতে গিয়েছিলাম টাঙ্গাইলে। সেখানে খেলতে গিয়ে দেখি আমাদের প্রতিপক্ষ তখনকার জাতীয় দলই ধরতে গেলে। আদমজী কলেজ আর তিতুমীর কলেজ মিলিয়ে গিয়েছিলাম, মঞ্জু ভাই, নান্নু ভাই ছিলেন প্রতিপক্ষ দলে, সেখানে ভালো খেলেছিলাম, মঞ্জু ভাই আমাকে ডেকে  পেশাদার খেলোয়াড় হবার কথা বললেন।

ম্যানিয়াক্সঃ আপনার প্রথম ক্লাব ছিলো রহমতগঞ্জ…

কায়সার হামিদঃ হ্যাঁ প্রথম ক্লাব ছিলো রহমতগঞ্জ, ১৯৮২তেই। তারপর ১৯৮৫তে মোহামেডানে, ক্যারিয়ার শেষ করেছিলাম মোহামোডানেই  অবসরের আগ পর্যন্ত।

ম্যানিয়াক্সঃ এখনকার ফুটবল আর আপনাদের সময়ের ফুটবলের পার্থক্যটা কিভাবে দেখেন, দর্শকের কথাই যদি বলেন?

কায়সার হামিদঃ তখন দর্শক অনেক বেশী হতো,এখন দর্শক অনেক কম হয় এটা সত্যি। তখন তো টিভি চ্যানেল অতো ছিলোনা, এখন টিভি খুললেই টপ মোষ্ট প্লেয়ারদের খেলা দেখা যায়। আর তখন তো দূর দূরান্ত থেকে বাস ভাড়া করে লোক আসতো, দশটার ভিতরে স্টেডিয়াম প্যাকড হয়ে যেতো।

ম্যানিয়াক্সঃ এই পার্থক্যটার কারণ কি মনে হয় আপনার কাছে?

কায়সার হামিদঃ আসলে একটা সময়ে আমরা একটা ব্যাচ রিটায়ার করার পরে, আমি ,মুন্না ,আমরা সবাই যখন ৯০ দশকের শেষে রিটায়ার করলাম তখন রিপ্লেসমেন্ট হিসেবে ঐ মানের খেলোয়াড় আর আসেনি। একটা গ্যাপ হয়ে গেলো, দর্শক ও ধীরে ধীরে দূরে সরে যেতে লাগলো।

ম্যানিয়াক্সঃ ভালো মানের প্লেয়ার প্রডিউস করতে না পারাটা কি আমাদের ব্যার্থতা নয়?

কায়সার হামিদঃ এটার জন্য তো আসলে অনেক দিন থেকেই অনেক কিছু দায়ী। অনেক জায়গার জেলা ভিত্তিক লীগগুলো ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে গেলো। তৃণমূল থেকে খেলোয়াড় আসা কমে গেলো এই কারণে। জেলা ভিত্তিক লীগ না হলে প্লেয়ার আসবে কি করে। বিশ্বকাপ খেলা অনেক  দেশের জনসংখ্যা আমাদের চেয়ে অনেক কম।  স্কুল ফুটবল শুরু হলো, আসলাম ভাই, আমি সহ কমিটিতে ছিলাম, বেশ কিছু ভালো প্লেয়ার আসলো। অনুর্দ্ধ ১৬ দলে খেললো, তারপর আবার বন্ধ হয়ে গেলো। নার্সিংটা আর হচ্ছেনা, বিকেএসপির মতো প্রতিষ্টান প্রতি জেলায় জেলায় থাকা দরকার,যেখানে এই প্লেয়ারদের যত্ন নেয়া হবে। লিওনেল মেসিকেই দেখেন, তাকেও তো ছোটবেলাতেই প্রতিভা দেখে এনে নার্সিং করানো হয়েছিলো বলেই সে আজকের মেসি হয়েছে।

ম্যানিয়াক্সঃ তৃণমূলের ফুটবলে আপনি কি কাজ করছেন স্যার?

কায়সার হামিদঃ তৃণমূলে বলতে স্কুল ফুটবলের জন্য ফেডারেশান ডাকলে আমরা যাই। আসলে তাঁর জন্য তো সেভাবে ফান্ডিং নাই, স্পন্সর নাই। কোটি কোটি টাকা লাগে। দেশে অনেক বিত্তবান আছেন যারা চাইলেই বিকেএসপির মতো কয়েকটা প্রতিষ্টান করতে পারেন, সেক্ষেত্রে হয়তো নার্সিংটা একটা পদ্ধতিতে করা সম্ভব।

ম্যানিয়াক্সঃ আরেকটা কারণ হতে পারে যে আমাদের অনেক মাঠ নষ্ট হয়ে গেছে, খেলাধূলার জায়গা কমে গেছে…

কায়সার হামিদঃ না, আপনি যদি শুধু  শহর চিন্তা করেন তাহলে তো হবেনা। গ্রামেও যেতে হবে, সেখানেও অনেক প্রতিভাবান ফুটবলার আছে, যাদের আমরা আনতে পারছিনা,তাদের সার্ভিসটা কখনোই পাচ্ছিনা। গ্রামে খেলার পরিবেশ আছে, ইউনিয়ন পর্যায়ে জোর দিতে হবে।

ম্যানিয়াক্সঃ আরেকটা ধারণা তৈরী হয়েছে, মাঠে দর্শক গেলেই ফুটবল বাঁচবে, এটা কি পুরোপুরি সত্য?

কায়সার হামিদঃ দর্শক মাঠে গেলে তো ফুটবলার অনুপ্রানিত হয়। আগে যখন একটা খেলোয়াড় ভালো পাস দিতো, ড্রিবল করে চলে যেতো… পুরো স্টেডিয়ামে গর্জন হতো। একটা শট বারের কোনা দিয়ে চলে গেছে, পুরো স্টেডিয়ামে শব্দ হতো ইশ… অনেক দূর থেকে,কয়েক কিলোমিটার দূর থেকে মাঠের মাঝখানে আওয়াজ টা আমরা পেতাম। এই ব্যাপারটা কিন্তু ভালো খেলার জন্য জরুরী…

ম্যানিয়াক্সঃ আপনার আইডল কে ছিলেন স্যার?

কায়সার হামিদঃ ছোটবেলায় মঞ্জু ভাই, নান্নু ভাই দুইজনের খেলাই ভালো লাগতো। একজন মোহামেডানে আরেকজন আবাহনীতে খেলতেন।

ম্যানিয়াক্সঃ আপনার প্রিয় ক্লাব?

কায়সার হামিদঃ মোহামেডান।

ম্যানিয়াক্সঃ বিদেশে?

কায়সার হামিদঃ বিদেশে, বার্সেলোনা, ম্যানচেষ্টার ইউনাইটেড।

ম্যানিয়াক্সঃ জাতীয় দলে?

কায়সার হামিদঃ ব্রাজিল।

ম্যানিয়াক্সঃ প্রতিটা ক্লাবেই বিদেশী স্ট্রাইকাররা খেলে, জাতীয় দলের খেলোয়াড়রা বেঞ্চে থাকে…

কায়সার হামিদঃ এটা সত্যি, আমিও দেখেছি। জাতীয় দলের খেলোয়াড় বেঞ্চে বসে ছিলো। এটার কারণ কি ? কারণ ঐ পজিশনে বিদেশী খেলোয়াড় খেলেছে , আমাদের জাতীয় দলের খেলোয়াড় বেঞ্চে বসে ছিলো। ভালো মানের  খেলোয়াড় থাকলে কোন ক্লাবই বিদেশী ফুটবলার আনবেনা, আমাদের পজিশনে বিদেশী ফুটবলারের দরকার হয়নি। ঐ তৃণমূল থেকেই গড়ে তুলতে হবে।

ম্যানিয়াক্সঃ জাতীয় দলে বিদেশী খেলোয়াড় খেলানো নিয়ে কথা হচ্ছিলো, এই ব্যাপারে আপনার ব্যাক্তিগত মতামত আছে কি?

কায়সার হামিদঃ ভালো মানের খেলোয়াড় হলে খেলাতে সমস্যা দেখিনা। অনেক দেশই খেলাচ্ছে, এতে প্রতিযোগীতা বাড়বে আরো।

আরো পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *