Saturday, 21 Apr 2018

টিকিটাকার জন্মদাতাঃ দ্যা গডফাদার

অসাধারণ এক মুভ, প্রায় ১৭-১৮টা পাস খেলার পর হঠাৎ কিলার পাস, বক্সে ঢুকে গেলেন লেফট উইঙ্গার, দারুণ গোল! ছোট ছোট পাস এর এই দারুণ মুভ দেখে হয়ত আপনার মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসলো একটা কথা, “একেবারে বার্সেলোনার টিকিটাকা দেখি!”

টিকিটাকা, গত দশকে পেপ গার্দিওলার অমোঘ অস্ত্র, যা তাকে জিতিয়েছে ট্রফির পর ট্রফি। এই জন্যই বোধ করি, অনেকেরই ধারণা, টিকিটাকার জন্ম গার্দিওলার হাত ধরে। দুঃখজনকভাবে, ব্যাপারটা তা না।

টিকিটাকার জন্ম ১৯৯০ সালের দিকে, বার্সেলোনাতেই। আবিষ্কারকের নাম? এ আবার জিজ্ঞাসা করতে হয়? ইয়োহান ক্রুইফ ছাড়া কে হবেন?

এর আগে খেলোয়াড় থাকা অবস্থায় বার্সেলোনাকে লীগ জিতিয়েছেন, রিয়াল মাদ্রিদকে করেছেন চূড়ান্ত অপমান। ১৯৮৮ সালে যখন কোচ হয়ে ফিরলেন, তখন বার্সেলোনার তাদের এল সালভাদরকে খুব দরকার, খুব!

খেলোয়াড় থাকাকালেই যাবার সময় বার্সেলোনাকে আয়াক্সের মত একাডেমি বানিয়ে যেতে বলেছিলেন, কোচ হয়ে এসে ফায়দা তুললেন।

আর্জেন্টিনা উরুগুয়েতে একটা নাচ চলে খুব, ট্যাঙ্গো নাম। ছোট ছোট পা ফেলে ধীরে ধীরে গতি বৃদ্ধি করে এরপর হঠাৎ নাচের মুদ্রা পৌছে যায় সর্বোচ্চ গতিতে। আর্জেন্টিনা উরুগুয়ের সীমানা রিভারপ্লেটে জন্ম নেওয়া এই নাচকে ফুটবলেও টেনে আনলো এই দুই দেশ, ছোট ছোট পাসে খেলা শুরু করলো। ট্যাঙ্গো নাচে যখন ছোট ছোট করে স্টেপ নেওয়া হয়, তখন তাকে রীতিমত অর্থহীন মনে হয়, তেমনি ট্যাঙ্গোতেও শুরুতে একের পর এক ছোট পাস দেওয়া শুরু হয়, যা দেখে আপনার মনে হবে এ তো বিষদাঁতহীন পাসিং, কি আর হবে! কিন্তু হঠাৎ এই পাসিং খুব দ্রুত হবে, আর হঠাৎ করে একজন এনগাঞ্চে বল হোল্ড করে কিলার পাস দিয়ে দেবেন বক্সে, হতবাক প্রতিপক্ষ দেখবে বিষদাঁতহীন সাপের বিষেই তাদের মৃত্যু হয়েছে। এই ট্যাঙ্গোর জোরেই প্রথম বিশ্বকাপ ফাইনালে জয়ী দলের নাম উরুগুয়ে, রানার্স আপ আর্জেন্টিনা!

ক্রুইফ অবশ্য আর্জেন্টাইন উরুগুইয়ান কোনোটাই নন, তিনি ডাচ। আয়াক্সের একাডেমি থেকে উঠে এসেছেন, আয়াক্সকে করেছেন বিশ্বের সেরা দল। কিছুদিন পর যখন কোচিং ক্যারিয়ার শুরু করেন, তাও আয়াক্স থেকেই। খেলেছেন রাইনাস মিশেলসের অধীনে, ক্লাব আর জাতীয় দল দুই জায়গায়। ডাচ, রাইনাস মিশেলস আর ইয়োহান ক্রুইফ – তিন মেলালে কি হয়? জ্বি ঠিকই ধরেছেন, টোটাল ফুটবলের কথাই বলছি।

মিশেলসের আয়াক্স আর নেদারল্যান্ডস জাতীয় দল দুটোই বিখ্যাত ছিলো তাদের বিখ্যাত প্লেয়িং স্টাইলের জন্য, টোটাল ফুটবল। টোটাল ফুটবল বলতে গেলে এক আজব ফুটবলিং স্টাইল, যাকে আপনি আসলে ডিফাইন করতে গেলে বড় ঝামেলায় পড়বেন! টোটাল ফুটবলে মাঠে কোন প্লেয়ার এরই ফিক্সড কোন পজিশন ছিলো না, কন্টিনিউয়াসলি তারা পজিশন সোয়াপ করতেন, কোন ম্যান অরিয়েন্টেড প্রেসিং নেই, অন দ্য বল হার্ড প্রেস করে বল রিকভার করতেন। এই দলে খেলা প্রতিটা খেলোয়াড়ের ওয়ার্করেট ছিলো অসামান্য, প্রতিটা প্লেয়ারই ছিলেন অসাধারণ। দুঃখের বিষয়, আয়াক্স টানা ৩ বার ইউরোপ সেরা হলেও, নেদারল্যান্ডস বিশ্বসেরা হয়নি, জার্মানিতে আটকে গেছিলো, সেটা অবশ্য বিশ্বকাপেরই আফসোস! ফাইনাল নিয়ে ক্রুইফ বলেন,

We lost one of the most important games of our lives, but I think that brought us more fame than we could ever have had by winning. Because everybody wanted us to win, that brought even more attention, sympathy and affection. For four weeks in that tournament no one was talking about winning or losing – the world audience just wanted to see the nice football we played. So, it is not an excuse, it is true – the result of the final doesn’t even bother me.

মানুষটা এমনই ছিলেন, তার কাছে রেজাল্টের চেয়ে অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ ছিলো স্টাইল, তিনি যেনতেনভাবে জিতলে খুশী থাকতেন না, তার প্রয়োজন ছিলো স্টাইলিশ হওয়া, যেন সবাই মুগ্ধ হয়। সাধে তো বলেননি, “Quality without results is pointless. Results without quality is boring.”

তাই এল সালভাদর যখন বার্সেলোনায় ফিরলেন কোচ হয়ে, তখন তিনি জানতেন, তাকে এমন কিছু করতে হবে, যা বিশ্ব আগে দেখেনি, আগে ভাবেনি। এবং তিনি বানালেনও, বিশ্ব শুধু অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলো!

ইয়োহান ক্রুইফ সম্পূর্ণ বিপরীত ধারার দুটো ফুটবলিং স্টাইল মেশালেন, লাতিন লো ওয়ার্করেট ট্যাঙ্গো আর ইউরোপিয়ান হাই ওয়ার্করেটের টোটাল ফুটবল, জন্ম দিলেন ফুটবলের অমর স্টাইল, টিকিটাকা।

টিকিটাকার মধ্যে আর্জেন্টাইন ট্যাঙ্গো যেমন প্রবলভাবে পাবেন, তেমনি পাবেন টোটাল ফুটবলও। ছোট ছোট অপ্রয়োজনীয় পাস দিয়ে শুরু, প্লেয়ারদের বার বার পজিশন সোয়াপিং, বল হারানোর পর কাউন্টার প্রেস, এইসব মিলিয়ে ইয়োহান ক্রুইফ বানালেন এক সর্ববিজয়ী স্টাইল, যেটা বার্সেলোনাকে এনে দিলো তাদের প্রথম ইউরোপিয়ান ট্রফি, টানা ৪ লীগ!

তখনকার ডাচ আর আয়াক্স দল নিয়ে ক্রুইফের একটা উক্তি আছে, “মাঠের বাইরে রাইনাস ছিলো, আর মাঠের ভেতর আমি”, টোটাল ফুটবলে মাঠের মাঝে একজন কোচ থাকা লাগে, যে কিনা ম্যাচ অপারেট করবে। ক্রুইফ টিকিটাকায় ও তাই করলেন, তার দলেও একজন ছিল।

বার্সায় আসার সপ্তাহখানেক পর ক্রুইফ যখন যুবদলের খেলা দেখতে যান, তখন হ্যাংলা পাতলা একজনকে মিডফিল্ডের ডানে খেলতে দেখলেন। যুব দলের কোচ চার্লস রেক্সাসকে তিনি তখন বলেন ছেলেটিকে পিভট রোলে খেলাতে। ছেলেটা খুব মানিয়ে গেলো, পরে জায়গা নিলো ক্রুইফের মূল দলেও। ছেলেটার নাম জানেন? পেপ গার্দিওলা, ক্রুইফের ড্রিম টিমের অন দ্য ফিল্ড কোচ, যিনি পরে কোচ হিসেবে টিকিটাকাকে পারফেকশন এনে দিয়েছিলেন।

৩-৪-৩ ম্যাজিক স্কোয়ার মিডফিল্ড ব্যবহার করে ইয়োহান ক্রুইফ এমন এক লাগামছাড়া ঘোড়া তৈরি করেছিলেন, যাকে ধরতে অপারগ ছিলো তখনকার রিয়াল মাদ্রিদও!

আর সেই অস্ত্রে ধার দিয়ে গার্দিওলা বানালেন সর্বজয়ী এক দল, সেই দলের প্রাণ ব্যবহার করেই স্পেনের ইউরো-বিশ্বকাপ-ইউরো জয়। স্পেন নেদারল্যান্ডসকে ২০১০ বিশ্বকাপ ফাইনালে হারানোর পর ক্রুইফ নেদারল্যান্ডসের ফুটবলকে আখ্যা দেন এন্টি ফুটবল হিসেবে, বলেন,

This ugly, vulgar, hard, hermetic, hardly eye-catching, hardly football style, yes it served the Dutch to unsettle Spain,” he said afterwards. “If with this then they got satisfaction, then fine. But they ended up losing. They were playing anti-football.

প্রশ্ন করতেই পারেন, তাহলে পেপ গার্দিওলা কেন বেশী সফল? কারণ, ক্রুইফের দল ছিলো একসাথে একাডেমি ও বাইরে থেকে কিনে আনা খেলোয়াড়দের মিশ্রণ, খেলোয়াড়দের এডাপ্টেশন সহ নানা সমস্যা ছিলো। গার্দিওলার দলের মিডফিল্ড ছিলো ৩ জন লা মাসিয়ান, তার চেয়েও বড় কথায়, টিকিটাকায় যে কোচ অন দ্য ফিল্ড প্রয়োজন ছিলো, জাভি, ইনিয়েস্তা, বুস্কেটস, ৩ জনই তাই। সাথে ছিলো মেসি, পেদ্রো, পুয়োল, পিকেদের মত খেলোয়াড়, যারা বলতে গেলে পুরো জীবনই ছিলেন একাডেমিতে টিকিটাকা খেলে অভ্যস্ত। তাই যখন পেপ টিকিটাকা খেলাতে চাইলেন, তার দলে অভাব ছিলো না অভ্যস্ত খেলোয়াড়ের। তবে এটি দিয়ে আপনি পেপের ক্রেডিট কমাতে পারবেন না, ক্রুইফ অতিমানব তৈরি করেছিলেন, গার্দিওলা তাকে বানিয়েছেন দৈত্য।

তাই যখন আপনাকে পরের বার কেউ বলবে টিকিটাকার আবিষ্কারক পেপ গার্দিওলা, তখন মুচকি হেসে বলে দেবেন, ফুটবল নামের ১১ গুটির দাবা খেলার এখন পর্যন্ত সবচেয়ে পারফেক্ট স্টাইলটা গার্দিওলার মাথা থেকে আসেনি, এসব শুধু একজনের মাথায়ই আসে, তার নাম ইয়োহান ক্রুইফ, দ্য গডফাদার অফ ফুটবল, যিনি একা হাতে ফুটবল বদলেছেন!

আরো পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *