Sunday, 24 Jun 2018

ও ফেনোমেনন, মাই ফেনোমেনন

মাইকেল ওয়েনকে চিনেন! যারা ফুটবল জানেন বা বুঝেন তাদের চেনারই কথা। যখন ফুটবলে এসেছিলেন তখন বিশ্বের অন্যতম সেরার কাতারে নিজেকে নেওয়ার সব উপাদান সাথে নিয়ে এসেছিলেন। তার উপর আরো ব্রিটিশ খেলোয়াড়। সে কি পেস আর এক্সিলারেশন! কি পরিমান লিথাল ছিলো, আপফ্রান্টে, তা তার খেলা না দেখলে বোঝার উপায় ছিলো না। কিন্তু ক্যারিয়ারের যখন সূর্য রশ্মি তার প্রখরতা প্রকাশ করতে শুরু করেছে তখনই ইনজুরির ছোবল। হাটুর ইনজুরিতে ক্যারিয়ার শেষ। এরপরে ফিরলেন ফুটবলে, কিন্তু সে মাইকেল ওয়েন আর কই!

অবশ্য দোষটা তার ছিলো না, ভাগ্যেরই দোষ। যারা পেস আর এক্সিলারেশন এর উপর নির্ভরশীল তাদের জন্য হাটুর ইনজুরি দুধের মধ্যে লেবুর ফোটার মতই ক্ষতিকর। আচ্ছা বাদ দেন। তারপরও বলতে হয় এমন কমই কাউকে খুজে পাওয়া যাবে যারা খুব বড়সড় ইনজুরির পর আবারো আগের মত লিথালি ফিরে আসবে। মে বি ইভেন রিইনোভেটিভভাবে নিজেকে পেশ করবে বিশ্বমঞ্চে। আর সবাইকে হতবাক করে দিয়ে ফুটবল বিশ্বের সর্বোচ্চ পুরস্কার ছিনিয়ে নিবে। একটু কঠিনই বোধহয় এমন কাউকে পাওয়া।

চলুন এবার একটু অন্যভাবে আলোচ্য বিষয় নিয়ে কথা বলি, বর্তমানে সব থেকে লিথাল স্ট্রাইকারের নাম বলুন তো! অনেকেই অনেকের কথা বলবেন। কেউ বলবেন সুয়ারেজ বা ইব্রাহিমোভিচ কেউ বলবেন আগুয়েরো বা কস্তা কেউবা বলবেন বেনজেমা, লেওয়ানডভস্কি বা মুলারের কথা। এদের মধ্যে যে কাউকে বেছে নিলে ক্ষতি নাই। আসলেই এরা রিয়েলি লিথাল। এবার একটু প্যাচেপুচে ঢুকি। আচ্ছা এদের স্ট্রেন্থ কি কি। অবশ্যই স্পেস খুজে বের করা, ফিনিশিং, পেস, শট একুরেসি, বডি স্ট্রেন্থ, এক্সিলারেশন। এসবই তো। তাছাড়া এট্রিবিউটিক্যালি পাসিং আর ড্রিবলিং তো আছেই। ক্রস,হেডিংও থাকবে নিশ্চয়ই।

আচ্ছা এবার একজন দেখান তো যে কিনা পেস, এক্সিলারেশন, ড্রিবল, স্কিল, ক্রসিং, শট পাওয়ার, বোথ ফুটেড স্ট্রেন্থ, স্পেস ইউজ, ডিফেন্ডার অকুপাই, ভিশন, মার্কিং, ইন্টারসেপটিং, বল কন্ট্রোলিং অলমোস্ট সবগুলোতে পারফেক্ট । সিউরলি পাবেন না। স্পেশালি এদের কেউই সেই অর্থে ভিশন, মার্কিং, ইন্টারসেপটিং, ড্রিবল এর সাথে স্কিলও পসেস করে না। এরকম স্ট্রাইকার পাওয়াটাই বিরল।

এবার এমন কেউ দেখান তো কেউ একই সাথে বার্সা-রিয়াল, ইন্টার-এসিমিলান এ খেলছে। পাবেন না বোধহয়। পাবেন না বললে আবার ভুল হবে খুব কমই আছে এমন কেউ। আবার ওল্ড ট্রাফোর্ডের গ্রেট দর্শকদের কাছ থেকে পারফরমেন্স দিয়ে স্ট্যান্ডিং ওভিয়েশন আদায় করে নিয়েছেন এমন কাউকে খুজে দেন তো। অবশ্যই শর্ত আছে, তিনি সে দিন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের হয়ে নয় অন্য দলের হয়ে ম্যানইউকে বিদায় করেছিলেন টুর্নামেন্ট থেকে।

অনেক কথা হলো চলুন এবার এর প্রসঙ্গে যাই। উপরে যাকে বা যাদেরকে খুঁজতে বললাম এমন কাউকে পেলেন! এমন একজন কিন্তু আছেন যিনি অনেক বড় ইনজুরির পর আবার ফিরে এসেছেন, বিশ্ব ফুটবলকে নাড়া দিয়েছেন। তিনি এমনই এক কমপ্লিট খেলোয়াড় এটাকিং এট্রিবিউটসের সাথে গেম ডিকটেটিং, মার্কিং, ইন্টারসেপটিং, ভিশন সাথে অকওয়ার্ড পজিশনিং (ফরোয়ার্ড পয়েন্ট অফ ভিউতে) সব ছিলো। দু দেশের বড় দুটো রাইভাল ক্লাবেই খেলেছেন, ম্যানইউকে বিদায় করে দিয়ে ম্যানইউর সমর্থকদের মন জয় করে নিয়েছেন। তিনি আর কেউ নন। তিনি রোনালদো।

না, উনি ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো নন উনি রোনালদো নাজারিয়া লিমার কথা বলছি। এক্সেটলি মোটা বা টাকলু রোনালদো, বেতাইল্যা চুলের রোনালদো, দাতালো রোনালদোর কথা বলছি। ফুটবলার রোনালদো মানেই এক্সট্রা কিছু। সে ফেনোমেনোন রোনালদো(নাম্বার নাইন), ম্যাজিশিয়ান রোনালদো(দিনহো) কিংবা ওয়ারিয়র রোনালদো(CR7) যেই হোক।

রোনালদো নাজারিয়া দ্য লিমার কথা বললেই ভেসে উঠবে সেই ফেইন্ট, সেই স্টেপ ওভার, সেই ইলাস্টিকোগুলোর কথা। বিশ্বকাপে কানের বিরুদ্বে সেই দ্রুপদী লড়াইয়ের কথা, তুরস্কের বিপক্ষে সে টোপোক গোলটার কথা, বিশ্বকাপের কামব্যাকের কথা। এত সমৃদ্ধ, এত সফল একজন খেলোয়াড়ের শুরুটা দরিদ্র পরিবার থেকেই। ব্রাজিল মানেই ফুটবল আর সাম্বা দুইয়ে মিলে “জোগো বোনিতো।” আর যার শুরুটা হয় পথে পথে ফুটবল খেলে। অলিতে গলিতে ফুটবল নিয়ে কারিকুরির চেষ্টা আর অদম্য ইচ্ছা সাথে একটু ঈশ্বর প্রদত্ত দান এসবের সমন্বয়েই গ্রেটেস্ট ফুটবলার হওয়ার সামর্থ্য অর্জন। এ ফুটবলার তার পরশ দেয়া শুরু করেন ক্রুজেইরোতে। দুর্দান্ত শুরু পেশাদারি ক্যারিয়ারে। তারই পুরস্কারস্বরূপ স্বপ্নের ব্রাজিল দলে অভিষেক তাও আবার চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীদের­ বিপক্ষেই। ৯৪ এ বিশ্বকাপ স্কোয়াডে জায়গা। যদিওবা খেলা হয়নি কোনো ম্যাচ। রোমারিওর হাতে বিশ্বকাপ। দুঙ্গা রোমারিওদের সেলিব্রেশনের মাঝখানে দাতালো হাসির এক কিশোর। কেউ যেন তখন তাকে বলেছিলো তোমার পায়েই আগামী যুগে ফুটবল বিশ্ব শাসিত হবে। হলও তাই। শুরুটা পিএসভি এইন্ডহোভেন এ যোগের মধ্যে দিয়ে। সেখানে গোলের বন্যা ভাসিয়ে দিয়ে বার্সাতে যোগদান। তখন তার ক্যরিয়ারে রক্তিম সূর্য ছলছল করছে।

৪৭ গোল ৪৯ ম্যাচে। তাও ২০ বছর বয়সে। অনেকটা একক নৈপুন্যে তিনটা শিরোপা। তার পুরস্কারস্বরূপ সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে ফিফা প্লেয়ার অফ দ্য ইয়ার এর স্বীকৃতি অর্জন, ৯৭ এ কোপা জয়। ৯৮ এ স্বপ্নের বিশ্বকাপ। গত বিশ্বকাপে যে স্বপ্ন দেখেছিলো, সে স্বপ্নকে লালিত করেই এ বিশ্বকাপে। প্রতিটা দলকে চূর্নবিচূর্ন করে ব্রাজিল ফাইনালে। এ ফাইনালে তোলার পিছনের হাতটা এ রোনালদোরই। ফাইনালে উঠার আগ পর্যন্ত ৪ গোল ৩ এসিস্ট, ফাইনালে সবকিছু এলোমেলো। ফাইনালের ৭২ মিনিট আগে দলে নেই রোনালদো। সবাই হতবাক। ইভেন ফিফা কতৃপক্ষ মারিও জাগালোকে জিজ্ঞেস করে এ ব্যাপারে সিউর কিনা যে টিম শিটটা ঠিক আছে। পরে জানা যায় রোনালদো আগের রাতে হাসপাতালে ছিলেন। রোনালদোবিহীন ব্রাজিলের অবস্থা খারাপ হয়ে যায় ফাইনালে। কোচ উপায় না দেখে রোনালদোকে নামিয়ে দেন। কিন্তু শেষ রক্ষা আর হলো কই! প্যারিসে হারলো ব্রাজিল, কাঁদলো ব্রাজিল, হাসলো ফ্রান্স। একমাত্র স্বান্তনা হিসেবে বিশ্বকাপে জিতলেন সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার গোল্ডেন বল। ২০০০ এর দিকে চরম এক ইনজুরিতে পড়েন রোনালদো। সবার মতেই ক্যারিয়ার এখানেই শেষ হয়ে যাওয়ার কথা ছিলো তার। কিন্তু তিনি যে রোনালদো। ফিরে আসলেন। ফিরে আসলেও কতটুকু আগের রোনালদো হয়ে উঠবেন তা বলা মুশকিল ছিলো। লুই ফেলিপে স্কলারি সবাইকে অবাক করে দিয়ে বিশ্বকাপ দলে জায়গা দিলেন। আর শুধু তাই না, একেবারেই প্রথম একাদশে। এবার রোনালদো ফিরলেন সত্যিই রোনালদো ফিরলেন তবে না পেস আর এক্সিলারেশন নির্ভর রোনালদো না, মোর ট্যাকটিক্যাল এট্রিবিউটস ওয়ালা রোনালদো। দিনহো আর রিভালদোর সাথে জুটি গড়ে দলকে নিয়ে আসলেন ফাইনালে।

প্যারিসের রাগ ঝাড়লেন ইয়োকোহামাতে। পুরো টুর্নামেন্টে এক গোল খাওয়া কান কে গুনে গুনে দিলেন তিন গোল, যার মধ্যে দু গোলই রোনালদোরই করা। তারপরও কানের পারফরমেন্স না দেখলে বোঝার উপায় নেই যে কান কি করেছিলো আর রোনালদোর কি করতে হয়েছিলো তাকে বিট করার জন্য। এবার বিশ্বকাপ তার হাতে, ব্রাজিলের হাতে, দ্য আর নাউ পেন্টা উইনার। এবার জিতলেন গোল্ডেন বুট। বিশ্বকাপের পরপরই যোগ দিলেন রিয়ালে। যোগ দেয়ার সাথে সাথেই জার্সি বিক্রির রেকর্ড। রিয়ালের হয়ে অভিষেক ম্যাচে স্ট্যান্ডিং ওভিয়েশন প্রথম সিজনে লীগ শিরোপা জয়। এরপর আবারো ইনজুরির কবলে। ইনজুরি বারবার হানা দিয়ে তার ক্যারিয়ার সমৃদ্ধ হতে দেয়নি। ২০০৬ বিশ্বকাপে ৩ গোল করে নাম লিখালেন বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনে। যেটা সম্প্রতি ক্লোসা ভেঙ্গে ফেলেছেন। মাঝে এক বছর এসিমিলানে খেলে চলে গেছেন ব্রাজিলে। সেখানে অবসর নেওয়ার আগে কেঁদেছেন নিজে, কাঁদিয়েছেন সকল ফুটবলানুরাগীদের। ইনজুরি তার ক্যারিয়ারকে আর দীর্ঘায়িত হতে দিলো না।

কে বলতে পারে যদি তিনি ইনজুরি মুক্ত থাকতেন হয়ত ম্যারাডোনা পেলে বিতর্কই থাকতো না। মেসি রোনালদো বিতর্কও এত মসলাযুক্ত হতো না। কিন্তু ভাগ্যের ফের নামের একটা কথা আছে। যেটাতে কাটা পড়েছে তার ক্যারিয়ারের অনেক মুল্যবান সময়।

ক্যারিয়ারের যখন ইতি টেনেছেন নামের পাশে ফিফা বর্ষসেরার স্বীকৃতি বিশ্বকাপ জয়, কোপা জয় তার সাথে বিশ্বকাপ ও কোপার সেরা খেলোয়াড়ের খেতাব তো আছেই, কনফেডারেশান কাপ সবই জিতেছেন প্রায়। শুধু একটাই অপূর্নতা। কখনো জিতা হয়নি চ্যাম্পিয়নস লীগ। এখন যদি চ্যাম্পিয়নস লীগ শিরোপা কোনো মানুষ হত আর তাকে যদি জিজ্ঞেস করা হত তোমার অতৃপ্ততাটা কি! একটাই কথা বলতো বোধহয়। রোনালদোর ঠোটের স্পর্শ আমি পাইনি।

স্ট্রাইকার বললেই চোখে ভেসে উঠে, ডিফেন্ডারদের পিছন থেকে রান, যেটাকে রান বিটুইন দ্য ডিফেন্ডার বলে। সেটাতে বোধহয় না তার থেকে বেটার কেউ ছিলো। কেউ আছে এখন। এক্সট্রা এক্সিলারেশন এ ডিফেন্ডারদের ছিটকে ফেলতে পারতেন খুব সহজেই। যদিওবা ঐ ইনজুরির পর এক্সিলারেশন অনেকাংশেই কমে গিয়েছিলো।তার আর একটা গ্রেট স্ট্রেন্থ ছিলো খুব কম স্পেসকে অকুপাই করতে পারা। তার থেকে বেটার এ ব্যাপারে রোমারিও ছাড়া হার্ডলি কাউকে পাওয়া যাবে না। আর তার সাথে অসাধারন বল কন্ট্রোল তো আছেই। বিশেষ করে চেস্ট কন্ট্রোল এবং ভলি – দেখার মত ছিলো। আর মিডারদের সাথে তার আই কো অর্ডিনেশন, আন্ডারস্ট্যান্ডিং ইজিলি হয়ে যেতো। যেটা কমবেশি ক্লাব পাল্টানোর সাথে সাথে ল্যাক করে। কিন্তু তার ক্যারিয়ার ঘেটে ক্লাব বদলের পর প্রথম সিজনটাই দেখবেন আউট আউট স্ট্যান্ডিং। তার মত ড্রিবলিং গুনওয়ালা স্ট্রাইকার খুব কমই আছে। অনেক গোলই আছে তিনি তিন চারজনকে একাই বিট করে গোল করেছেন।

আর একটা জিনিস অবাক করার মত সেটা তার পজিশনিং। কখনও উইং এ, কখনো ডিফেন্সিভ মিড এ কখনও এটাকিং মিড এ। মার্কিং করে তাকে বেধে রাখা এজন্য কষ্টকর ছিলো খুবই। উল্টো তিনি মার্কিং আর ইন্টারসেপ্টিং চমৎকার ছিলো। তার ম্যাচ প্রতি বল রিকভারি, বল স্টোলিং এর রেট দেখলে তা বোঝা যাবে। আর যেটা দেখার মত ছিলো তার ভিশন। থ্রু বলে চমৎকার ছিলেন তিনি। ক্রসিং ও যথেষ্ট ডিসেন্ট ছিলো। ফ্রি কিক কনভার্সেশন রেটও ভালোই বলা চলে।

তিনি আর একটা কাজ ভালো করতে পারতেন সেটা হলো ভালোই গেম কন্ট্রোল করতে পারতেন। বন্ধ করে বলা যায়,তার মত স্ট্রাইকার পাওয়া এখন অনেক দুষ্কর। আপনারা এখন তার সাথে মেসি ক্রিসের তুলনা দিতে আসবেন। সিরিয়াসলি ভাই আপনারা পারেনও। মেসি ক্রিস অন্য লেভেলের নিশ্চিত। কিন্তু ইনি তাদের থেকে আরো কয়েক লেভেল উপরে। জাস্ট ইনজুরিটাই শেষ করে দিয়েছে। না হলে সবাই আমার সাথে একমত হতেন এতক্ষনে। কিছু কিছু স্কিল যেমন ইলাস্টিকো, ফেইন্ট, স্টেপ ওভার এসব ফেমাস করেছিলেন তিনিই। ও জানেন তো তাকে সবাই ফেনোমেনন নামেও চিনে।

ফুটবলে এত সব গুন নিয়ে জন্মাতে খুব কম ফুটবলারই পেরেছে। দ্যয়ার ইজ বেকেনবাউয়ার এন্ড দেয়ার ইজ রোনালদো নাজারিয়া দ্য লিমা। তারা অনন্য । কমপ্লিট এন্ড ইটস বেস্ট। ফুটবল কোথাও হয়ত অপূর্ন থেকে যেতো যদি রোনালদো ফুটবল না খেলতেন। আমরা ভাগ্যবান যে তার ফুটবলসুধা আমরা পান করতে পেরেছি।

আরো পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *