Sunday, 24 Jun 2018

দ্য ফিজিক্স বিহাইন্ড দ্য নাকলবল

কল্পনা করুন, আপনি একটা বল ছুঁড়ে মারলেন, বলটা বাতাসেই একবার ডানে যাচ্ছে, আরেকবার বামে যাচ্ছে, এভাবে আঁকাবাঁকা করে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে, এরকমটা করতে পারলে নিজেকে ম্যাজিশিয়ান ভাবতেন? আফসোস করছেন, এরকমটা শুধু কল্পনাতেই সম্ভব, বাস্তবে নয়! কিন্তু সত্যটা হচ্ছে সম্ভব! নাকলবলের পরিচিতি বেসবল গেমে অনেক, ইতিহাস যদি খেয়াল নাও করে থাকেন তবে হালের ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, গ্যারেথ বেলের কারণে ফুটবলেও নাকলবল শট এখন তাদের ট্রেডমার্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে। সামগ্রিকভাবে নাকলবল টেকনিক সর্বপ্রথম ডেভলাপ করে বেসবল প্লেয়ার এডি সিকোটে।

এই নাকলবল শটটা কি? কি হয় এতে? বলকে খুবই লো স্পিন অথবা নো স্পিনে কিন্তু হাই পেসে শ্যুট করার পরে বল একটা জিগজ্যাগ তরঙ্গ ক্রিয়েট করে সাইড টু সাইড মুভমেন্ট করতে করতে যায় এবং শেষে ডিরেকশন চেঞ্জ করে ফেলে, ফলে গোলকিপারদের জন্য বলের গতিপথ বুঝা খুবই কষ্টকর হয়ে পড়ে, ভুল ডিরেকশনে চলে যায়, ফলশ্রুতিতে গোল হয়। নাকলবল শ্যুট ফুটবলে শ্যুটিংয়ে একটা অ্যাডভান্সড টেকনিক, বলে কোনো স্পিন না থাকায় (ডেড বল), গোলকিপারের কাছে কোনো ক্লুই থাকে না বল কোথায় যাচ্ছে, গোলকিপারের কাছে জাস্ট এতটুকু নলেজ থাকে যে বল হঠাত ৪ দিকের যে কোনো একদিকে যেতে পারে, যা খুবই ফ্রাস্ট্রেটিং।

নাকলবলকে ধরা সো ডিফিকাল্ট কারণ নাকলবলের আনইউজুয়াল অনিশ্চিত গতিপথ। বল বাতাসে সোজা ভাসা শুরু করে কিন্তু হঠাতই যেকোনো ডিরেকশনে মুভ করে, বুনোভাবে ফ্লাইটের শেষের দিকে সাইড টু সাইড মুভ (রাফলি ২০ সেন্টিমিটার) করতে থাকে। এজন্য সারা পৃথিবীতে ন্যাচারালি খেলোয়াড়, কোচরা এর পিছনের সায়েন্সের ব্যাপারে জানতে খুবই উদগ্রীব। নাকলবল রহস্যের একটা সিক্রেট পার্ট হল এর স্পিন বা বলা যায় ল্যাক অফ স্পিন। বেসবল বা ক্রিকেটে এটা ডিপেন্ড করে বোলারের আঙ্গুলের গিটের মাঝে বল ধরার উপর, সাথে ছোঁড়ার সময় জাস্ট ফিঙ্গারটিপ ইউজ করা যাতে বলে কোনো স্পিন না থাকে। কিন্তু ফুটবল শটে কি করা হয়? যুক্তরাজ্যের লিডিং ইউনিভার্সিটির ফিজিসিস্ট কেন ব্রে ২০০৯ সালে তার লেখা ‘How to Score: Science and the Beautiful Game’ ফিজিক্স বইয়ে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর ফ্রিকিককে ফিজিক্যাল ব্যতিক্রম হিসেবে আখ্যায়িত করে তিনি লিখেন

To our eyes, some goalkeepers may appear stupefied, but in truth they are not at fault. If they are headed towards goal, the Portuguese’s shots are very difficult to save. No one shoots like this, except perhaps Sunderland’s Kieran Richardson. And the goals have nothing to do with luck.

ফ্রান্সের ইকোল পলিটেকনিক এর সায়েন্টিস্ট তাদের এক্সপেরিমেন্টের ইনিশিয়াল ফাইন্ডিং থেকে প্রেডিক্ট করে, ফুটবলে নাকলবল ইফেক্ট দেখা সম্ভব না, তাহলে কি হতে পারে ক্রিস্টিয়ানোর সিক্রেট। এর পিছনে রয়েছে যে সিক্রেট, ফিজিসিস্টরা যাকে বলে ড্রাগ ক্রাইসিস। ফ্লুইড ডায়নামিক্সে ড্রাগ ক্রাইসিস এমন একটি ফেনোমেনন যেখানে ড্রাগ কোইফিশিয়েন্টের মান হঠাত করে কমে যায়। রাউন্ড শেপ লাইক গোলক, সিলিন্ডারের উপরে নিয়ে অনেক স্টাডি করেছে সায়েন্টিস্টরা। ড্রাগ কোইফিশিয়েন্ট হল সেই ভ্যালু যেটা কোনো বস্তুকে ফ্লুইড যেমনঃ বাতাস, পানিতে ডিরেকশন চেঞ্জ করার ক্ষেত্রে বাঁধা দেয়। যত কম এই ইফিশিয়েন্টের মান, ততবেশি বস্তু বাতাস অথবা পানিতে নিজের ডিরেকশন থেকে ড্রাগ করে অন্য দিকে চলে যায়। ফুটবলের ক্ষেত্রে এর মান ০.৪৭, কিন্তু যখন নাকলবল শ্যুট করা হয় তখন এর মান কমে ০.২ পর্যন্ত নেমে যায়। নাকলবল শ্যুটের একটা স্পেসিফিক গতিতে এই ক্রিটিক্যাল ট্র্যাঞ্জিশনের সৃষ্টি হয়, সেজন্য শুরুতে বল সোজা ডিরেকশনেই আসতে থাকে, কিন্তু ড্রাগ কোইফিশিয়েন্টের ক্রিটিক্যাল পয়েন্টে রিচ করার পরে বল ঐরকম অদ্ভুত বিহেভ করা শুরু করে। সেজন্য টেবিল টেনিস, বাস্কেটবল, ভলিবলে আমরা নাকলবল দেখতে পাই না, কারণ নাকল ইফেক্ট পেতে হলে ন্যূনতম ২৭ মিটার দূরত্ব থাকা আবশ্যক।

শিউরলি বর্তমানে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো হল কিং অফ দ্য নাকলবল, গ্যারেথ বেল হল তার প্রডিজি। রোনালদো নিজে এই টেকনিক ইউনিকলি নিয়ে আসেননি, তিনি জাস্ট রপ্ত করেছেন এই টেকনিককে। ফুটবলে লিজেন্ডারি নাকলবলকে ফেমাস করেন জুনিনহো। রনের ফ্রিকিকে সূক্ষ্ম ভ্যারিয়েশন আছে কিন্তু ফর্মার লিয়ন প্লেয়ার জুনিনহো পার্নামবুকানো পার্ফেক্টলি এই স্টাইল ব্যবহার করে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল। জুনিনহোর নাকলবল টেকনিক ইউজ করেই রোনালদো কিছু ফ্রিকিকের সময় বলকে খুব উপরে উঠায় এবং টপ স্পিনের কারণে হঠাত করে খুব নিচে নেমে যায়, আবার নাকলবল ইফেক্টেরই আরেক ভার্সনে বল জিগজ্যাগ ট্র্যাজেক্টরি ক্রিয়েট করে ডিরেকশন চেঞ্জ করে ইনসাইড আর আউটসাইডে মুভ করে।

২০১২ সালে আমেরিকান ফিজিজ্যাল সোসাইটির (এপিএস) ডিভিশন অফ ফ্লুইড ডায়নামিক্স ক্যালিফোর্নিয়ার স্যান ডিয়েগোতে এক মিটিংয়ে রিসার্চারদের একটা টিম করা হয় নাকলবল ফেনোমেননের রহস্য উদঘাটন করার জন্য। তার পরিপ্রেক্ষিতে তারা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকে ডেকে আনে, এবং তার শ্যুট এক্সপেরিমেন্ট করে। দেখা যায় নর্মাল শটে বল যেদিকে মুভ করত (ছবির লাল কার্ভ), রোনালদোর নাকলবল শুরুতে সে ডিরেকশনে গেলেও শেষে ডিরেকশন চেঞ্জ করে গোলকিপারকে বিভ্রান্ত করে (ছবির সবুজ কার্ভ)!

সাধারণত বলের দুই বিপরীত পাশে বাতাসের গতি থাকে ভিন্ন এবং বাতাসের চাপে ডিস্ট্রিবিউশন কন্সট্যান্টলি পরিবর্তন হতে থাকে, এজন্য সকার বলকে একদম সঠিক গতিতে কিক করা লাগে (ক্লোজ টু ড্রাগ ক্রাইসিস থ্রেসহোল্ড), শ্যুট করতে হয় পায়ের সুইট স্পট (ইনস্টেপ অফ ফুট) দিয়ে বলের মিডলে যাতে বলে কোনো স্পিন না থাকে, এই ফ্যাক্টটা খুবই ইম্পরট্যান্ট, যদি বল রোটেট না করে, তবে এর বলের গতিপথ বাতাসের ফ্লো দ্বারা অ্যাফেক্ট হয় এবং বাতাসে বলের মুভমেন্ট সৃষ্টি করে।

রিসেন্টলি রিসার্চে ধরা পরেছে মোস্ট ইম্পরট্যান্ট ফ্যাক্ট হল ফুটবলে আনপ্রেডিক্টেবল শ্যুট করা, ফুটবলে শ্যুট করার ইনিশিয়াল কন্ডিশনের সাথে দরকার কিকের সময় পায়ের আনস্টেডি লিফট ফোর্সও। সেজন্য ফুটবলকে হিট করা হয় বুটের ফিতাএর অংশ দিয়ে। সেইম রিজনেই বলে যত বেশি সিম থাকে, তত বেশি নাকলবল ইফেক্ট বেড়ে যায়।

রানআপের শুরুতে ফুসফুসের বাতাস সব বের করে নেয়া লাগে, তা নাহলে যথেষ্ট পাওয়ার ক্রিয়েট হয় না, সাথে ব্যথাও পাওয়া লাগে, সেজন্য গভীর একটা দম নিয়ে সতর্ক রান ৪-৬ স্টেপের রানআপ দিতে হয়, রানআপেই ম্যাক্সিমাম স্পিড দিয়ে দিলে নাকলবল প্রোডিউস করার এনাফ এনার্জি বলে দেয়া যায় না। নাকলবল রপ্ত করা এজন্য আরও বেশি কঠিন, হয় প্লেয়াররা বলে ওভারহিট করে ফেলে, নয়তো বলে এনাফ কন্ট্যাক্ট করতে না পেরে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। স্ট্যান্ডিং ফুটকে বলের কাছাকাছি বলের লাইন বরাবর রাখা মাস্ট। বলের সাথে কন্টাক্টের পরে স্ট্রাইকিং ফুটকে গোলের দিকে রাখা লাগে, এটা বলের লাস্ট ডিরেকশন ঠিক করে দেয়, শটের শেষে নর্মাল ফলোথ্রুয়ের বদলে হাঁটুকে থুতনির যতটা সম্ভব কাছে নিয়ে আসা লাগে, এটা নাকলবল শ্যুটের সবচেয়ে ডিফিকাল্ট পার্ট। লাস্ট মোমেন্টে শুটিং পায়ের যতটা সম্ভব পিছনে উপরে তুলে লেংথ বাড়িয়ে শ্যুট করা লাগে, কিন্তু উরুর মুভমেন্ট থাকে খুবই অল্প যাতে হাই এমাউন্ট অফ লেগ স্পিড জেনারেট হয় এবং সেটা হিপ আর উরু দিয়ে বলে এনাফ পাওয়ার ট্রান্সফার করা যায় (সামেশন অফ ফোর্স কনসেপ্ট)। লাস্ট স্টেপের লেংথ যত বড় হয়, তত বেশি হিপ টেন্ডন্স প্রসারিত হয়, যার প্রতিক্রিয়া এসে পরে পায়ের শ্যুটে। পুরো প্রসেসে মাথা এবং চোখ বলের দিকে রাখা লাগে, শ্যুটের লাস্ট মোমেন্টে চোখ থাকতে হয় একদম বলের ভারকেন্দ্র বরাবর লাইন মেইনটেইন করে। এতকিছুর পরেও নাকলবলের গতিপথ শুধু শ্যুটিংয়ের ইনিশিয়াল রিলিজ কন্ডিশনের উপরেই ডিপেন্ড করে না, বাতাসের ফ্লোয়ের উপরেও এটি অনেকখানি ডিপেন্ড করে। তো এখন, এই শট ঠেকানোর উপায় কি?

গোলকিপারকে কারেক্টলি তার ডিফেন্স ওয়াল সেটআপ করতে হবে যাতে সে দেখতে পায় শ্যুটারের পা থেকে বলটা কিভাবে রিলিজ হচ্ছে এবং তারপরেই তাকে রিয়াক্ট করতে হবে নাকলবল একদমশুরুতে যে ডিরেকশনে মুভ করে সেই দিকে। এই মুহুর্তে ফুটবলে সারাবিশ্বে টপ ৩ জন নাকলবল হিটারের নাম নিলে আসবে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, গ্যারেথ বেল আর F2 freestylers দের নাম, সো আলাদাভাবে নাকলবল ইফেক্ট দেখতে হলে, এদের ফলো করতে পারেন আপনি।

আরো পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *