Sunday, 24 Jun 2018

পর্তুগিজ রাজকুমার থেকে ইতালির রাজা

রূপের জাদুতে হাজারো রমনীর মন জয় করা ও পায়ের জাদুতে অসংখ্য ফুটবল ভক্তের হৃদয়ে নিজের স্থান গড়ে নেওয়া ফুটবলার তিনি। লম্বা চুল, চাপ দাড়ি, শিন প্যাড পর্যন্ত নামানো মোজাতেই তাকে দেখা গিয়েছে সবসময়, এই যেনো তার ব্র‍্যান্ড। লোকে বলে সে হলো এমন ফুটবলার যার ছবি যেকোনো ফুটবল ভক্ত নিজের দেওয়ালে টাঙিয়ে রাখতে চাইবে। বলছিলাম পর্তুগিজ পোস্টার বয় রুই কস্তার কথা

এমন একজন ফুটবলার যে খেলাটাকে দিয়েছিলেন একটা নান্দনিক রূপ। লুইস ফিগো ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর কারনে কিছুটা আড়ালে পড়ে গেলেও পর্তুগিজ ফুটবল সম্বন্ধে সামান্য জ্ঞান রাখা কারো কাছে সে যেনো এক আশীর্বাদ স্বরুপ। পর্তুগীজ ফুটবলের জন্য কস্তা তো আসলেই ছিলেন একজন আশীর্বাদ। দলটির গোল্ডেন জেনারেশনের অন্যতম সদস্য ছিলেন, ছিলেন তরুণ ফুটবলারদের আদর্শ। পর্তুগীজদের মনে ‘আমরাও পারি’ বিশ্বাসটা তো এসেছিলো তার সময়তেই।

রুই কস্তার শুরুটা হয়েছিলো ইউসেবিওর হাত ধরে। মাত্র ৫ বছর বয়সে এই কিংবদন্তীর চোখে পড়ে যান এবং সেখান থেকেই বেনফিকার একাডেমিতে জায়গা হয় তার। ৯০ সালে ডেব্যুর পর বেনফিকার জন্য যেনো হয়ে যান নতুন আশার আলো। তার হাত ধরেই দুই বছরে দুইটি ট্রফি জিতে তারা। এরপর ১১ বছর অধরা লীগটাও ছুয়ে দেখে পর্তুগীজ লীগের দলটি। এমন সাফল্য তাকে দেয় ফ্যানদের প্রিয় মুখের মর্যাদা যা তিনি গড়েছিলেন নিজের পায়ের জাদুতে। ভালোবেসে তাকে বলা হতো বেনফিকার রাজকুমার।

কস্তা ছিলেন একজন ক্লাসিক নাম্বার ১০। মূলত প্লে মেকার হিসেবে খেলে থাকলেও ভার্সেটাইলিটি দিয়ে নিজেকে অনন্য করেছিলেন তিনি। এটাকিং মিডফিল্ডার থেকে শুরু করে সেকেন্ড স্ট্রাইকার, ডিপ, উইং সবখানেই সমান তালে খেলতে পারতেন। তার অসামান্য ভিশন ও নিখুঁত পাসিং দিয়ে এসিস্টের পর এসিস্ট করেছেন। তার ড্রিব্লিং এবং স্কিল ছিলো অসাধারণ। আর তিনি খেলতে পারতেন দু পায়ে যা তাকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করতো।

কস্তা শুধু ফ্যানদের চোখেই পড়েননি, পড়েছিলেন বড় লীগের দলগুলোর চোখেও। সেই থেকেই বেনফিকাকে হারাতে হয় নিজেদের মধ্যমণিকে। ইতালিয়ান ক্লাব ফিয়োরেন্টিনার ৬ মিলিয়ন ইউরোর বিশাল অফার ফেরাতে পারেনা আর্থিক সমস্যায় থাকা বেনফিকা। ফিয়োরেন্টিনার বিপক্ষে বেনফিকার হয়ে শেষ প্রীতি ম্যাচটি খেলেন তিনি। সে ম্যাচে অসাধারণ চিপ শটে গোল করে যখন তিনি দর্শকদের কাছে যান তখন নিজের অশ্রু আটকে রাখতে ব্যর্থ হন। হয়ত এইটাই বুঝিয়ে দিয়েছিলেন যে শুধু সমর্থকদের ভালোবাসাই পাননি তিনিও তাদের ভালোবেসেছিলেন সর্বস্ব দিয়ে।

ফিয়োরেন্টিনায় যখন তার আগমন হয় তখন সে সময় জুভেন্টাসের হয়ে খেলছিলেন জিনেদিন জিদান। কিন্তু পর্তুগিজ রাজকুমার যে এসেছিলেন ইতালিতে রাজত্ব করতে। তাই তো একাধিকবার সেরা নাম্বার ১০ নির্বাচিত হয়েছিলেন সিরিয়া এ তে। জিতেছিলেন দুটো কোপা ইটালিয়াও।

অনূর্ধ্ব -২০ বিশ্বকাপজয়ী কস্তা যে সময়ে জাতীয় দলে আসেন সে দলটাই পরবর্তিতে পর্তুগালের সোনালী প্রজন্ম হিসেবে পরিচিতি পায়। ৯৬ থেকে ২০০৪ ইউরোরর যথক্রামে কোয়ার্টার ফাইনাল, সেমি ফাইনাল, ফাইনাল খেলা দলটির একটাই আক্ষেপ রয়ে যাবে আর তা শিরোপার ছোয়া না পাওয়া।

এরপর ৪৩ মিলিয়নের বিনিময়ে এসি মিলানে যেয়ে হয়ে যান ক্লাবটির ইতিহাসের সবচেয়ে দামী খেলোয়াড়। সে যেনো এক স্বপ্ন যাত্রার শুরু। যে যাত্রায় কস্তা সিরি আ, কোপা ইটালিয়া, চ্যাম্পিয়ন্স লীগ, ইউরোপিয়ান সুপার কাপ সব জিতেছিলেন। জিতেছিলেন অগণিত ভক্তের হৃদয়ে জায়গা যা হয়তোবা এখনো অক্ষুণ্ণ। নিজেকে পরিণত করেছিলেন সময়ের সেরাদের একজনে।

সব কিছুরই সমাপ্তি থাকে এবং সমাপ্তির পর বাড়ি ফিরতে হয়। ২০০৬ সালে কস্তাও বেনফিকায় ফিরে এসেছিলেন ইতালি ছেড়ে। ঘরের ছেলে ঘরে ফিরা যাকে বলে। তিনি যখন বেনফিকা ছেড়েছিলেন তখন তিনি ইতালিতে গিয়েছিলেন একজন রাজপুত্রের মতন। আর যখন ফিরলেন তখন ফিরলেন ইতালির রাজা হয়ে।

আরো পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *