Saturday, 21 Apr 2018

রেইনাল্ড পেদ্রোস – এক পেনাল্টি মিসেই ঝরে যাওয়া এক প্রতিভা

রেইনাল্ড পেদ্রোস (Reynald Pedros), ফ্রেঞ্চ ন্যাশনাল টিমের সাবেক এটাকিং মিডফিল্ডার, বর্তমানে একজন টিভি পন্ডিত এবং ফ্রেঞ্চ ক্লাব অলিম্পিক লিওনের মহিলা টিমের ম্যানেজার। অবশ্যই বিখ্যাত কেউ নন এবং এই তথ্যগুলো দিয়ে আপনি তাকে মনেও রাখবেন না! খোদ ফ্রান্সেই তিনি এই পরিচয়ে বিখ্যাত না বরং একজন খলনায়ক হিসেবেই পরিচিত – যার পেনাল্টি ব্যার্থতায় ফ্রান্সকে বিদায় নিতে হয়েছিল ইউরোর মতো বড় আসর থেকে! অথচ এককালে প্রতিভার কারণে এই সুদর্শন বাবরি চুলের ফুটবলারটির তুলনা হতো কিংবদন্তী ফুটবলার জিনেদিন জিদানের সাথে!

ফ্রান্সের লরেতে ১৯৭১ এর ১০ই অক্টোবর জন্মগ্রহন করেন পেদ্রোস। ক্যারিয়ার শুরু হয় ফরাসি ক্লাব এফসি নান্তেসের বি টিমে ১৯৮৭ সালে। ১৯৯২-৯৩ সিজনে প্রমোশন পান নান্তেসের সিনিয়র টিমে।

দারুণ পাসিং, স্পিড এবং ফিনিশিং স্কিল সম্পন্ন পেদ্রোস নান্তেসে দুই সতীর্থ স্ট্রাইকার প্যাট্রিস লোকো এবং নিকোলাস উয়িদেকের সাথে গড়ে তুলেন এক ড্রীম ট্রায়ো। ১৯৯০-৯১ ও ৯১-৯২ সিজনে ১২তম এবং ৯ম স্থানে লীগ শেষ করা নান্তেস এই ট্রায়োর ম্যাজিকে উঠে আসে লীগের ৫ নাম্বার পজিশনে ৯২-৯৩ সিজনে। এবং দীর্ঘ ১২ বছর পর ৯৪-৯৫ সিজনে জিতে নেয় তাদের ৭ম লীগ টাইটেল। পেদ্রোসের ক্রিয়েটিভিটি এবং লোকো-উয়িদেকের ফিনিশিং ছিল নান্তেসের লীগ টাইটেল পুনরুদ্ধারের মূল শক্তি।

এই ট্রায়োর কল্যাণে ৯৫-৯৬ সিজনের ইউসিএল সেমিফাইনালেও পৌঁছে যায় নান্তেস, যেটা ইউরোপিয়ান ফুটবলে এই ফ্রেঞ্চ দলটির সেরা সাফল্য। পেদ্রোস সে আসরে করেন ৩ গোল। এর মধ্যে গ্রুপ স্টেজে পর্তুগালের বিখ্যাত ক্লাব পোর্তোর বিপক্ষে দুটি দুর্দান্ত গোল ছিল!

ক্রিয়েটিভ লেফট ফুটেড মিডফিল্ডার পেদ্রোসের ফিনিশিং স্কিল ও ছিল দুর্দান্ত। কাউন্টার এটাকে কিংবা ওয়ান টু ওয়ানে দুই সতীর্থ লোকো-উয়িদেকের মতোই বিপদজনক স্কোরার ছিলেন। ওয়ান টু ওয়ানে গোলকিপারকে কাটিয়ে কিংবা দারুণ চিপ শটে বোকা বানানোর অধিকারী ছিলেন পেদ্রোস। ক্যারিয়ারের সেরা ফ্রী-কিক গোলটা আপনাকে মনে করিয়ে দিবে ২০০২ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে করা রোনালদিনহো গাউচো’র সেই জাদুকরি গোলটার।

পেদ্রোসের বেস্ট গোলগুলোর লিংকঃ

৯৪ বিশ্বকাপের কোয়ালিফায়ারে ব্যর্থ হবার পর ফ্রান্স ন্যাশনাল টিম থেকে ছেটে ফেলা হয় এরিক ক্যান্টোনা, জিয়ান পিয়েরে পাপিন, ডেভিড জিনোলার মতো তারকাদের। ফ্রান্স ফুটবল তখন ৪ বছর পরের ঘরের মাঠে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া বিশ্বকাপ উপলক্ষ্যে তরুণ প্রতিভাবান ফুটবলারদের নিয়ে দল গড়ার উদ্দ্যেগ নেয়। জিনেদিন জিদান, লিলিয়েন থুরামদের মতো প্রতিভাবানদের সাথে রেইনাল্ড পেদ্রোসের নামটাও তখন উপরের দিকে ছিল। পজিশন একই হওয়ায় তুলনাটা তাই জিদানের সাথেই হতো বেশি!

নান্তেসের হয়ে দুর্দান্ত পারফর্মেন্সের স্বরূপ ফ্রান্স ন্যাশনাল টিমে ডাক আসে ১৯৯৩ সালে, রাশিয়ার বিপক্ষে এক প্রীতি ম্যাচে। ন্যাশনাল টিম জার্সিতে প্রথম গোল আসে আজারবাইজানের বিপক্ষে ৯৪ বিশ্বকাপ কোয়ালিফায়ার ম্যাচে। ১০ গোলে আজারবাইজানকে বিধ্বস্ত করার সেই ম্যাচে ৪র্থ গোলটি আসে পেদ্রোসের পা থেকে। বিশ্বকাপ কোয়ালিফায়ারের পর ফ্রান্স ন্যাশনাল টিমে অনেক পরিবর্তন আসলেও নিজের জায়গা ধরে রাখেন এবং ৯৬ এর ইউরোর পূর্বে দলের সাথে ইংল্যান্ডের বিমান ধরেন।

দলের এটাকিং মিডফিল্ডার পজিশনে অভিজ্ঞ জোয়ার্কায়েফ এবং দেশের সেরা প্রতিভাবান ফুটবলার জিনেদিন জিদান থাকায় পেদ্রোস স্টার্টিং একাদশে সুযোগ পেতেন না ইউরোতে। জিদান অথবা অন্য কোন মিডফিল্ডারের সাব হিসেবেই নামতেন। ৯৪ বিশ্বকাপ কোয়ালিফায়ারের ব্যর্থতা ভুলে ইউরোর সেমিফাইনালে জায়গা করে নেয় তারুণ্য নির্ভর ফ্রান্স, তাও আবার বার্গক্যাম্প, ক্লুইভার্ট, কোকুদের নেদারল্যান্ডসকে হারিয়ে। ওল্ড ট্র্যাফোর্ডের সেমিফাইনালে ফ্রান্সের বাঁধা তখন পুঁচকে চেক রিপাবলিক, যারা সে আসরের চমক।

কিন্তু এই পুঁচকে চেক রিপাবলিকের বিপক্ষেই ১২০ মিনিট ধরে গোলশূন্য থাকলেন জিদান, জোয়ার্কায়েফ, লোকোরা। ৬২ মিনিটে আক্রমণের ধার বাড়াতে ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার সাব্রি লামৌচির বদলে নামেন পেদ্রোস – কিন্তু তাতেও কোন লাভ হয় নি। খেলা গড়ায় টাইব্রেকারে!

দুই দলের প্রথম ৫ শটেই গোল আসে। সাডেন ডেথের প্রথম শটটি নিতে আসেন রেইনাল্ড পেদ্রোস, কিন্তু তখন হয়তো ঘুনাক্ষরেও বুঝতে পারেননি এই কিকটিই হতে যাচ্ছে তার ক্যারিয়ার বিধ্বংসী স্পট কিক! নার্ভাস পেদ্রোসের দুর্বল মাটি ঘেষা কিকটি খুব সহজেই ফিরিয়ে দেন চেক গোলকিপার পিওতর কৌবা! নেক্সট শটে মিরোস্লাভ কাদলেচ লক্ষ্যভেদ করলে ফ্রান্সকে টাইব্রেকে ৬-৫ এ হারিয়ে ইউরো ফাইনালে চলে যায় চেক রিপাবলিক! পেদ্রোসের পেনাল্টি ব্যর্থতায় অঘটনের স্বীকার হয়ে সেমিফাইনাল থেকে বিদায় তারুণ্য নির্ভর ফ্রান্স!

পুনর্গঠনের মধ্যে দিয়ে ফ্রান্স চেক রিবাপলিকের মতো ছোট দলের কাছে হারলেও জিদান, জোয়ার্কায়েফের মতো তারকারা কিংবা কোচ এমে জ্যাকে এতোটা সমালোচিত হননি। কিন্তু সেই সমালোচনা থেকে বিন্দু মাত্র ছাড় পাননি পেদ্রোস! ফরাসি সমর্থকদের সব রোষ গিয়ে পরে পেনাল্টি মিস করা ঐ পেদ্রোসের উপর! ফরাসিদের কাছে পেদ্রোস বনে যান জাতীয় শত্রু! দর্শকদের দুয়ো এবং মানুসিকভাবে ভেঙ্গে পড়া পেদ্রোস এরপরে কখনোই আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেননি, এরপর থেকেই শুরু হয় এক প্রতিভাবান ফুটবলারের হারিয়ে যাওয়ার গল্প!

৯৬ এর ইউরোর পর পেদ্রোস ফ্রান্স দলে সুযোগ পান মোট ৩ বার – মেক্সিকো, তুরস্ক আর ডেনমার্কের বিপক্ষে। ফ্রান্স কোচ এমে জ্যাকেও চেষ্টা করেছিলেন তার মনোবল এবং ফিটনেস ফিরিয়ে এনে তাকে ন্যাশনাল টিমের উপযুক্ত রাখা – কিন্তু সেটি ছিল এক ব্যর্থ প্রচেষ্টা! ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে স্বাগতিকদের কাছে ১-০ গোলে হারা ম্যাচটিই ছিল পেদ্রোসের শেষবারের মতো জাতীয় দলের জার্সি গায়ে জড়ানো।

সেই ইউরোর পর ক্লাব ক্যারিয়ারেও কখনো আলো ছড়াতে পারেননি পেদ্রোস। ইউরোর পর নান্তেস ছেড়ে মার্শেই, নাপোলি, লিওন, পার্মার মতো ক্লাবেও যোগ দিয়েছেন – কিন্তু আশ্চর্জজনকভাবে কোন ক্লাবেই এক বছরের বেশি টানা সার্ভিস দিতে পারেননি! মন্তপেলিয়ের, তুলুজ, বাস্তিয়ার মতো ফ্রান্সের দ্বিতীয় সারির ক্লাবে লোনে কিছুদিন কাটানোর পর পর ক্যারিয়ার শেষ কটা দিন গেছে ইসরাইল, কাতারের দুটি অখ্যাত ক্লাবে। ২০০৯ সালে নিচু সারির সুইস ক্লাব এফসি বালুমসে খেলোয়াড়ি জীবনের ইতি টানেন পেদ্রোস!

সম্ভাবনাময় ক্যারিয়ারের এমন হতাশাজনক পরিসমাপ্তির কারণ শুধুমাত্র ঐ পেনাল্টি মিসই ছিল না! ইঞ্জুরি, ভুল সিদ্ধান্ত এবং কিছু ব্যাড লাকও দায়ী ছিল। কিন্তু টার্নিং পয়েন্ট – ইউরো সেমিফাইনালের সেই পেনাল্টি মিস! যার কারণে জিদান, জোয়ার্কায়েফ, থুরাম, অরিদের মতো সর্বজয়ী হিরো হওয়ার বদলে এক আসরের ভিলেনই থেকে গেলেন পেদ্রোস!

অবশ্য এ নিয়ে আফসোস এখন কমই করেন পেদ্রোস – “আমি আমার সর্বোচ্চটুকুই চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু শেষটা ছিল এর সম্পুর্ন বিপরীত! এটি ছিল চরম হতাশাজনক!”

নান্তেসে উজ্জ্বলভাবে শুরু করা ক্যারিয়ারের এরকম হতাশাজনক সমাপ্তি নিয়ে তিনি বলেন – “এখন আমার মনে হয় নান্তেসের শিক্ষাটা আমার ভুল ছিল। নান্তেসে যে সংস্কৃতি ধারণ করে বেড়ে উঠেছিলাম, অন্য ক্লাবে সেই সংস্কৃতিটা এরকম ব্যতিক্রম হতে পারে তা আমার জানা ছিল না!

কেউ সেই পেনাল্টি মিস নিয়ে কিছু বললে সাধারনত তিনি যা বলেন –

“যা নিয়ে এখন মূল্যহীন তা নিয়ে ভেবে সময় নষ্ট করার পক্ষপাতী আমি না! আমি গর্বিত যে আমি পেনাল্টি কিকটি নিয়েছিলাম, এটি আমার দায়িত্ব ছিল!”

“সেই পেনাল্টি মিস নিয়ে কেউ কোন কটু কথা বললে সেটা সবচেয়ে বেশি ব্যাথিত করে আমার পরিবার এবং বন্ধুদের। আমিতো হেসেই উড়িয়ে দেই সেই স্মৃতি!”

“আমার কাছে মানবিক দিকটাই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ন – তা হচ্ছে সবার আবেগ এবং অনুভূতি! বল জালে জড়ালো কি জড়ালো না তার থেকে এটিই সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ন বিষয়!”

টাইব্রেকারে, পেনাল্টি অথবা ওপেন চান্সে গোল মিস করে হতাশায় ডুবানো খলনায়করাও আমাদের মতো আবেগ-অনুভুতি সম্পন্ন মানুষ তাই নয় কি?

আরো পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *