Sunday, 24 Jun 2018

কি হতে যাচ্ছে রাশিয়ায়?

আসছে ২০১৮ ফুটবল বিশ্বকাপ। এই নিয়ে  শুরু হয়ে গেছে উন্মাদনা। প্রতিটি দেশের সামর্থকরা উদগ্রীব হয়ে রয়েছেন টুর্ণামেন্টে তাদের দলের পারফর্মেন্স দেখার জন্য। সবারই আশা নিজেদের দল চ্যাম্পিয়ন হবে। দলগুলোও বিশ্বকাপ জয়ের লক্ষ নিয়ে সাজিয়েছে নিজেদের দল। চেস্টা করেছে প্রতিটি পজিশনে সবচেয়ে সেরা খেলোয়াড়টিকে নেয়ার। এভাবে তারা প্রস্তুত হচ্ছে আসন্ন যুদ্ধের জন্য।
আসন্ন বিশ্বকাপে শিরোপা জয়ের ফেভারিট হিসেবে অনেকে ধরে নিচ্ছেন ৫ বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলকে, অনেকে ফেভারিট মানছেন ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন জার্মানিকে, কেউ কেউ ফ্রান্সকে ধরেই নিয়েছেন পরবর্তী চ্যাম্পিয়ন হিসেবে, অনেকে ভাবছেন স্পেন আবার তাদের রাজ্য ফিরে পাবে, আবার অনেকে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে কোয়ালিফাই করা আর্জেন্টিনারও বিশ্বকাপ জয় করার স্বপ্ন দেখেন।এছাড়া বেলজিয়াম আর বর্তমান ইউরোপ চ্যাম্পিয়ন পর্তুগাল তো আছেই। এই বিশ্বকাপের জন্য দারুণ একটি ব্যালেন্সিং দল গড়েছে ব্রাজিল। অভিজ্ঞতা, তারুণ্য, প্রতিভা সবকিছুর মিশেল রয়েছে দলটিতে। দলটির একমাত্র দূর্ভাগ্য বলা যায় বিশ্বকাপে তারা তাদের সেরা রাইট ব্যাক দানি আলভেজকে পাচ্ছে না। গোলপোস্টের নিচে অতন্দ্র প্রহরী এলিসন বেকার আর তার সামনে অভিজ্ঞ থিয়াগো সিলভা থাকায় তারা অনেকটা নির্ভার।

সেই তুলনায় জার্মানী দলটি বেশ অনভিজ্ঞ। তাদের অনেকেরই নেই বিশ্বকাপ খেলার অভিজ্ঞতা। কিন্তু তাদের তরুণরাও যে বড় জিনিশ জয়ের সামর্থ রাখে তা তারা দেখিয়ে দিয়েছে গত কনফেডারেশন কাপেই।অধিনায়ক ম্যানুয়েল নয়ার ফিট হওয়ায় তিনিই থাকবেন পোস্টের নিচে। বলা হয় তিনি মাছি পর্যন্ত আটকাতে পারবেন গোললাইন অতিক্রম করার আগে। তার সামনে বোয়াটেং, হামেলস, কিমিচ, হেক্টর যেকোন ফরোয়ার্ড লাইনকে আটকাতে সক্ষম।স্পেনকে নিয়ে যে কথা আলাদা করে বলতে হবে তা হল তাদের ডিফেন্স। পোস্টের নিচে দাঁড়াবেন সময়ের অন্যতম সেরা গোলরক্ষক ডেভিড ডি হায়া। তার সামনে থাকবেন রিয়াল মাদ্রিদ ও বার্সেলোনার দুই ভরসা রামোস আর পিকে।

ফ্রান্সেরও আছেন এই দুই ক্লাবের রাফায়েল ভারানে আর স্যামুয়েল উমতিতি। পোস্টের নিচে অধিনায়ক লরিস।পর্তুগালের ডিফেন্সের ভরসা পেপে আর গোলপোস্টের নিচে অনেকদিনের প্রহরী রুই প্যাট্রিসিও। তবে সেই তুলনায় খুবই নড়বড়ে ডিফেন্স নিয়ে আছে আর্জেন্টিনা ।ডিফেন্স লাইনে একমাত্র বড় নাম ওটামেন্ডি ।সেই সাথে বিশ্বকাপ শুরুর আগেই তারা হাঁটুর ইঞ্জুরিতে হারিয়েছে তাদের গোলপোস্টের নিচের ভরসা, গত বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠার অন্যতম কারিগর সার্জিও রোমেরোকে। ডিফেন্স লাইন মোটামুটি বলা যায় বেলজিয়ামেরও। প্রাচীর হিসেবে কোর্তোয়া থাকলেও ভার্মালিন আর কোম্পানীর ইঞ্জুরি নিয়ে কিছুই বলা যায় না। ডিফেন্স নিয়ে চিন্তা তেমন নেই ফ্রান্সেও। এই বিশ্বকাপের সবচেয়ে ব্যালেন্সিং দল ধরা হচ্ছে ‘৯৮ এর চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সকে। তাদের অবস্থা এমন হয়েছে যে কোচ দেশমকে পড়তে হয়েছিল মধুর সমস্যায় যে তিনি কাকে রেখে কাকে দলে নেবেন। দলের যদি দূর্বলতা দেখা হয় তা হবে ম্যানসিটির লেফট ব্যাক বেঞ্জামিন মেন্ডি এখনো পুরোপুরি ফিট নন। তার পরেও কোচ তাকে দলে নিয়েছিলেন। দলটির মধ্যমাঠ সামলাবেন সাবেক বিশ্বের সবচেয়ে দামি প্লেয়ার পল পগবা। বেলজিয়ামের ক্ষেত্রে প্রধানত এই দায়িত্বে থাকবেন ডি ব্রুইন। এছাড়া উইটসেল, ফেলাইনি আর জানুজাই তো আছেনই। ব্রাজিলে ডিফেন্ডিং মিডে ক্যাসেমিরো আর এটাকিং মিডে থাকবেন কৌটিনহো। রিয়াল মাদ্রিদ ও বার্সেলোনার অন্যতম সেরা এই দুই প্লেয়ারের উপর ভরসা করে ব্রাজিল নির্ভার থাকতেই পারে।জার্মানির হয়ে থাকবেন সামি খেদিরা, টনি ক্রুস আর এসিস্ট কিং মেসুত ওজিল। এই বিশ্বকাপে আমরা সবচেয়ে বেশি চান্স ক্রিয়েশন এই দল থেকেই আমরা পেতে পারি।

আর্জেন্টিনার হয়ে অভিজ্ঞ মাশ্চেরানোর আর বানেগার খেলার সম্ভাবনা রয়েছে খুব কম ।বিগলিয়া, আর আর অনভিজ্ঞ মেজা বা লো সেলসোকেই আমরা দেখতে পারি এখানে। পর্তুগাল যে এখানে অভিজ্ঞ মৌতিনহোর উপর ভরসা লাগবে তা বলাই বাহুল্য।বাকিদের নিয়ে বলার মত কিছু নেই। স্পেনের ফ্রন্টলাইনে যদিও কস্তা ছাড়া বাকিদের তেমন অভিজ্ঞতা নেই তেমন তবুও তাদের পেছনে যারা আছেন তাদের ক্ষমতা আছে স্ট্রাইকারদের মুখে গোল তুলে দেয়ার। বুস্কেটস, থিয়াগো, সিলভা, ইনিয়েস্তা এদের দিকে তাকিয়েই আছে সারা বিশ্ব। ভাগ্য খুব একটা খারাপ না হলে এই ভালভাবেই স্পেনের অনেকদূর যাওয়া উচিৎ এই লড়াইয়ে। তবে তাদের ফরোয়ার্ড লাইন নিয়ে দুশ্চিন্তা করতেই হয়। এই সব দিক দিয়ে বলতে গেলে খুবই পিছিয়ে আছে আর্জেন্টিনা। দলের অর্ধেকের বেশি প্লেয়ার এইবার প্রথমবারের মত বিশ্বকাপ খেলতে যাচ্ছেন। ডিফেন্স খুব খারাপ হলেও তাদের আক্রমণভাগে যারা আছেন তারা নিজ নিজ ক্লাবে ঐ পজিশনে বেস্ট। হিগুয়েন, ডিবালা,আগুয়েরো,পাভন, লাঞ্জিনি সবাই সক্ষম ভাল কিছু করার। তবে ক্লাবে যতই ভাল হোক, জাতীয় দলের জার্সি গায়ে চাপালেই তাদের উপর খারাপ খেলার ভূত চেপে বসে। আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় উইক পয়েন্ট এখানেই। একজনের কথা আলাদা ভাবে বলতেই হয়, তিনি লিওনেল মেসি। তিনি দলে আছেন বলেই আর্জেন্টিনার সমর্থকরা আশায় আছেন তৃতীয় বিশ্বকাপ জয়ের।

একই আশা পর্তুগালকে নিয়েও। দলের অধিনায়ক ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো তার দল নিয়ে ২০১৬ সালেই জিতেছেন ইউরো। অভিজ্ঞতা-অনভিজ্ঞতার মিশেল রয়েছে দলটিতে। ইউরো পারলে বিশ্বকাপ কেন নয়?… সমর্থকরা আশা রাখতেই পারেন।আর শুধু রোনালদো জ্বলে উঠলেই হবে না, সেই সাথে তাকে সঙ্গ দেয়ার জন্য আছেন যে কোয়ারেজমা, তাকেও তার কাজ করতে হবে। ২০১৬ ইউরোর মত টিম গেম খেলতেই হবে তাদের। আর বেলজিয়াম দল বানিয়েছে ক্লাব ফুটবলে বেস্ট প্লেয়ারদের দিয়েই। তার পরও বেলজিয়াম সমর্থকরা হতাশ দারুণ ফর্মে থাকা রাজা নাইঙ্গোলানকে কোচ রবার্তো মার্টিনেজ দলে না রাখায়।তবে দলে থাকা অন্য প্লেয়াররাও কম নন। এডেন হাজার্ড, লুকাকু, জ্বলে উঠলে তাদের থামানোর ক্ষমতা নেই কারোর।

জার্মানির ফরোয়ার্ড পজিশনে বলার মত আছেন শুধু মুলার। তবে ইঞ্জুরি নিয়ে আর কোন সমস্যা না হলে মার্কো রিউসের শো আমরা দেখতে পারি। তবে ৩২ বছর বয়সী মারিও গোমেজকে নিয়ে কিছু বলা যাচ্ছে না এই মুহূর্তে। ব্রাজিল আর ফ্রান্স এই ফরোয়ার্ড লাইন নিয়েই আছে সবচেয়ে নির্ভার। বিশ্বের সবচেয়ে দামি প্লেয়ার নেইমারের সাথে খেলার জন্য আছেন ফিরিমিনো, জেসুস, উইলিয়ান। কোচ তিতে কিভাবে সিলেক্ট করবেন এইটা আমরা তা খেলার দিনই দেখতে পাব। আর ফ্রান্সে জিরুকে সামনে রেখে দুই পাশে খেলবেন এমবাপ্পে আর গ্রিজম্যান। হেড স্পেশালিস্ট জিরু, আর পিএসজি ও এটলেটিকো মাদ্রিদের অন্যতম সেরা দুই প্লেয়ার এমবাপ্পে আর গ্রিজম্যানকে সামলাতে হিমসিম খেয়ে যাবে অনেক ডিফেন্স লাইনই।

সব দিক বিবেচনায় আসন্ন বিশ্বকাপে মূল ফেভারিট ব্রাজিল, জার্মানি, স্পেন আর ফ্রান্সই। তবে ১৪ জুলাইয়ের ফাইনালে কে শেষ হাসি হাসবে তা সময়ই বলে দেবে। তখন হয়তো দেখা যেতেও পারে কোন অলখিত ফেভারিট বা কোন আন্ডারডগ টিমকে শিরোপা নিয়ে উল্লাশ করতে। সেই র্পযন্ত আমরা অপেক্ষায় আছি, অপেক্ষায় থাকবে পুরো বিশ্বই।
সেই সাথে অপেক্ষা আগামী ১৪ জুন পর্যন্ত একটি জমজমাট বিশ্বকাপের।

আরো পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *