Saturday, 21 Apr 2018

ফুটবলের কবি

ছেলেটা শান্ত।
সব সময়েই শান্ত। বেশি কথা বলেনা, হই চই করে না, ছোটাছুটি যতটা পারে কম করে। সে শুধু দেখে। অনেক দুর…অনেক অনেক দূর পর্যন্ত দেখে।

রিও কুয়ার্টোর পাশ ঘেঁষে বয়ে যাওয়া ছোট্ট নদীর শীতল জলে চিকচিক করে ওঠা লাতিন রোদ দেখে, সাদা সাদা মেঘের টুকরো নিয়ে উত্তরে ছুটে চলা অ্যান্টার্কটিকা থেকে আসা হাওয়ায় নাইতে থাকা সুনীল আকাশ দেখে, বিকেলবেলার লালচে হয়ে যাওয়া সূর্যটাকে জলের ভেতর ডুব দিতে দেখে।সব হইচই থেকে ছেলেটা হারিয়ে যেতে ভালবাসে, কিশোর বয়সে বন্ধুদের আড্ডার চাইতে তার প্রিয় সময় কাটানো সঙ্গী হয় দখিনের আকাশ, অনেক নীলের ভেতর জ্বলা কিছু রুপালি তারার সাথে তার কথা হয়।

ছেলেটা কথা কম বলে, তার গালের বামপাশটায় অশ্রুর মত একটা জন্মদাগ। আকাশের দিকে চেয়ে থাকা অলস ছেলেটা আঠার বছর বয়সে এসে দোটানায় পড়ে গেল, সে কি মেডিকেল কলেজে পড়বে, নাকি প্রেম করবে?

প্রথম প্রেমকে সে ছাড়তে পারলো না, মেডিক্যাল ছেড়ে দিল। তার নাম পাবলো সিজার আইমার, সে ফুটবলকে ভালোবেসেছিল, এক নীরব কবির মত, কবিতার মত করে সে বলটাকে ভালোবাসতো। রিভারপ্লেটে যখন সে খেলতে শুরু করলো, দুনিয়া তখন জিদান আর রোনালদোর পায়ের তলায়, মাত্র শেষ হয়েছে ম্যারাডোনা যুগ, আর্জেন্টিনা খুজে বেড়াচ্ছিল পরবর্তী জাদুকরকে, এরইমধ্যে রিভারপ্লেট মাতাতে শুরু করলেন আইমার, সাথে বন্ধু স্যাভিওলা, স্যাভিওলার বাড়িতে গিয়ে মিলানিস খেয়ে ঘুমিয়ে থাকতেন আইমার, প্র্যাকটিসেও চোখে লেগে থাকতো ঘুম ঘুম ভাব, সেই ঘুম ঘুম চোখেই তিনি অতিপ্রাকৃতিক সব কিলার পাস বাড়াতেন, এনগান্ঞো রোল থেকে মাঠের ডানপাশ আর বাম পাশে, পুরো মাঠে দৌড়োতে তাকে দেখা যেত না, তিনি তাকিয়ে থাকতেন বেশিরভাগ সময়, বলের দিকে, যেন সেই ছোট্ট ছেলেটা হয়ে গেছেন, বসে আছেন রিওর তীরে, একটু পরেই সূর্য ডুবলে বাড়ি যাবেন।

কোন তাড়াহুড়ো ছিল না তার ,প্রশান্ত মন নিয়ে টিমমেটদের ছোটাছুটি দেখতে দেখতে হঠাৎ করেই কেড়ে নিতেন বল। প্রেমিকাকে অন্যের সাথে আর কতক্ষন দেখা যায়? তারপর তিনি ভালোবাসতেন তার আজন্ম প্রিয়তমা ফুটবলটাকে, তিনি ভালোবাসতেন কবির মত করে, কবিতা বুঝতে হিমশিম খেতো ডিফেন্ডাররা, একের পর এক দুনিয়া ছাড়া স্কিল, ড্রিবল আর থ্রু পাস, অসম্ভব সৌন্দর্যের হাট বসতো আইমারের পা জোড়ায়, অলস শিল্পী বলতে যা বোঝায় তিনি তাই ছিলেন।

“আমি সুন্দর ফুটবল ভালোবাসি,আসলে আমি বলতে চাই আমি জন্মেছি সুন্দর ফুটবলের জন্য। কিন্তু আমি নিশ্চিত, পুরোপুরি নিশ্চিত, মানুষ জয় উদযাপন করতে ভালবাসে।” বলটাকে ভালবাসতে বাসতে তিনি রিভারপ্লেট থেকে উড়ে গেলেন ভ্যালেন্সিয়াতে, রাফা বেনিতেজের ভ্যালেন্সিয়ায়, প্রথম দর্শনে রাফা বুঝলেন এই ছেলে অন্য জাতের মানুষ, একে নিজের ট্যাকটিক্সে খেলালে হবে না, কবিকে তার মত ছেড়়ে দিতে হয়, নিজের কল্পনার ভুবনে, যেখানে সে নিজের মত করে কাব্য লেখে।

রাফা তাই আইমারের পেছনে সেট করলেন দুই শক্তিশালী ডেস্ট্রয়ার, যেন আইমারকে ডিফেন্স নিয়ে ভাবতে না হয়, দুপাশে বসালেন দুই তীব্রগতির উইঙ্গারকে, যেন আইমারকে উইংয়ে ছুটতে না হয়, আইমার ঘুরে বেড়াবে মাঠের মাঝখানটায়, নিজের ভুবনে, সেখান থেকে সে কাব্য লিখবে।

অলস সেই কবি তারপর যে কাব্যগুলো লিখেছিল তা সামলাবার ক্ষমতা বার্সেলোনা, এমনকি লস গ্যালাক্টিকোস রিয়াল মাদ্রিদেরও ছিল না, মাঠের ক্যানভাসে লেখা আইমারের কবিতাগুলো দিয়ে ভ্যালেন্সিয়া লা লীগা জিতলো পর পর দুবার, রিয়ালের মত দানব তখন ভ্যালেন্সিয়াকে থামাতে হিমশিম খাচ্ছিল, যে দলটা ছিল তারায় ঠাসা।ভ্যালেন্সিয়ার নামের পাশে হয়তো এখন একটা ইউসিএলও থাকতো, যদি না আইমারকে তুলে নিতে বাধ্য হতেন রাফা, ২০০২-০৩ চ্যাম্পিয়ন্স লীগ ফাইনালে, ম্যারাডোনা ২০০৩ সালে এমনি এমনি বলেন নি, আইমারই হচ্ছে একমাত্র ফুটবলার, যার খেলা দেখার জন্য আমি পয়সা খরচ করতে রাজি আছি, অথচ তখন ফুটবল জগৎ দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন জিদান, রোনালদিনহো, রোনালদো, ফিগো আর বেকহামরা।

তারপর রাফা বেনিতেজ ভ্যালেন্সিয়া ছাড়লেন, ক্লাদিও রেনেইরি হলেন নতুন কোচ, ইতালিয়ান ফুটবল ফিলোসফির ছাত্র রেনেইরি, যার ডিফেন্স ডিফেন্স আর ডিফেন্স নীতিতে বিরক্ত হয়ে গেলেন আইমার, তিধি কখনোই অন্যের মত করে খেলতে চাননি, তিনি চেয়েছেন নিজের মত করে খেলতে, ফুটবল তো তার ভালবাসা, আরেকজনের মত করে কি ভালবাসা যায়?

তারপর, একটু একটু করে বিষন্ন হতে থাকলেন আইমার, হতাশা ছুঁয়ে যেতে লাগলো তাঁকে, নিরস ডিফেন্সিভ ফুটবলের যুগ তখন ফুটবলকে আক্রান্ত করে ফেলেছে, কোচদের হিসেব নিকেশ ২০০৩-০৪ এ এসে বদলে গেল, যে ডিফেন্সে কন্ট্রিবিউট করতে পারে না, মাঠে যে প্রেসিং বা দৌড়াদৌড়িতে আগ্রহী না, তাকে আধুনিক কোচদের ভাল লাগে না।

বিরক্ত আইমার হারিয়ে ফেললেন ফর্ম, ভ্যালেন্সিয়া থেকে জারাগোজা, জারাগোজা থেকে বেনফিকা, বেনফিকা থেকে আবার বোকা জুনিয়র্স, ফুটবল বদলে গেছে অনেক! কিন্তু শান্ত, চুপচাপ “এল ম্যাগো” বদলাননি একটুও, এখনও তিনি একই ভাবে ভালোবাসেন তার চাইল্ডহুড সুইটহার্ট ফুটলটাকে।

আইমার হয়তো অনেক কিছু জেতেন নি, হয়তো অনেক গোল, অনেক অনেক অ্যাসিস্ট তার নামের পাশে নেই, হয়তো ডজন ডজন রেকর্ড ভাঙাগড়া তার ভাগ্যে ছিল না। তার ভাগ্যে ছিল, তিনি এক বঞ্চিত প্রেমিকের মত ফুটবলকে ভালবেসে যাবেন, ছলনাময়ী বহুরুপী ফুটবলটা তার প্রেম বুঝতে পারবে না এটাও বোধহয় তার ভাগ্যেই ছিল।

প্রিয় আইমার, সবাইকে বিখ্যাত হতে হয় না। আপনি বরং গাছের নিচে বসে তেপান্তরে তাকিয়ে থাকুন, দুর থেকে ভেসে যাওয়া আকাশের বুকে লেপটে থাকা মেঘেদের দেখুন, নদীর রুপালি জলে সোনালী রোদের ছটা দেখুন, লাতিন আকাশের নীল রজনীতে নক্ষত্রবীথির অনন্ত সৌন্দর্যে মগ্ন হোন আপনভোলা মন নিয়ে, আপনার পায়ে থাকুক সেই চিরচেনা ফুটবল, সেই না পাওয়া ভালোবাসা। আপনাকে চেনাতে হবে না আপনি সেরা ছিলেন, আমরা না হয় মেসির কাছ থেকেই শুনে নেবো, আপনি ছিলেন সর্বকালের সেরাদের একজনের আইডল, আমরা না হয় ম্যারাডোনার কাছে শুনবো, তার অবসরের পরেও লা প্লাটার সাভানাতে এসেছিল এক অলস রাখাল, ফুটবল মাঠকে যে কবিতার খাতা বানাতে চেয়েছিল, বিলিভ মি আইমার, আমরা আপনাকে ভুলবোনা, যতদিন সুন্দর ফুটবল বলে কিছু থাকবে, অলস শিল্পীরাও বেঁচে থাকবে, হয়তো তারা বিখ্যাত হবে না, কিন্তু তারা শিল্পী হবে, তারা স্বপ্নবাজ হবে।

হ্যাপি বার্থডে,এল ম্যাগো!!
লং লিভ,এল ফ্যান্টাস্টিস্তা!!

আরো পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *