Saturday, 26 May 2018

দ্যা গেম অব দেয়ার লাইভস

ফিফা আগেই নিয়ম করে দিয়েছিল যে এশিয়া, আফ্রিকা এবং ওশেনিয়া থেকে মাত্র একটি দল বিশ্বকাপে খেলতে পারবে। নিয়ম অনুযায়ী একমাত্র কোয়ালিফায়ারে কম্বোডিয়ায় মুখোমুখি হয় উত্তর কোরিয়া এবং অস্ট্রেলিয়া। ম্যাচটিতে ক্যাঙ্গারুদের ৯-২ গোলে উড়িয়ে দিয়েই বিশ্বকাপ খেলা নিশ্চিত করে একমাত্র এশিয়ান প্রতিনিধি উত্তর কোরিয়া।

হ্যা, ১৯৬৬ সালের ইংল্যান্ড বিশ্বকাপের কথাই বলছি। কোয়ালিফায়ারে অজিদের বিধ্বস্ত করলেও বিশ্বকাপে খেলতে পারবে কিনা তা নিয়ে বাঁধল নতুন এক সংশয়। ১৯৫০-৫৩ সালের কোরিয়ান যুদ্ধের জের ধরেই এই নতুন সংশয়ের উৎপত্তি। সে ঐতিহাসিক যুদ্ধে ব্রিটেন ছিল দক্ষিন কোরিয়ার পক্ষে। তবে যুদ্ধে মীমাংসা হয়ে যাবার ১৩ বছর পরও উত্তর কোরিয়ার সাথে সম্পর্কটা যেন গভীর হয়নি ব্রিটেনের। ফলশ্রুতিতে, গুজব উঠে বিশ্বকাপে কি আদৌ খেলতে পারবে কিনা উত্তর কোরিয়ানরা। টুর্নামেন্ট শুরু হওয়ার কিছুদিন আগে ব্রিটেন সরকার তাদের ভিসা দিতেও অপরাগতা জানায়। কারণ হিসেবে দেখায় তাদের উগ্রতা, উচ্ছৃঙ্খলতা। পরে অবশ্য ফিফা নানা ধরনের চাপ সৃষ্টি করে কোরিয়ানদের খেলার সুযোগ করে দেয়।

টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ নিয়েই যাদের এত কাহিনীর শিকার হতে হলো তারা আর কতদূরই বা যেতে পারবে? ব্রিটেনে পা দেবার আগেই উত্তর কোরিয়ার এটারন্যাল প্রেসিডেন্ট কিম আই সুং তার দলকে অনুরোধের সাথে বললেন “ইউরোপ, দক্ষিণ আমেরিকা ফুটবল শাষন করছে। এশিয়া, আফ্রিকার প্রতিনিধি হিসেবে তোমরা পারলে ২-১ টি ম্যাচ জিতে এসো।” হয়তো প্রেসিডেন্টের এই বিনয়ী মনোভাবই তাদেরকে মানসিক দিক থেকে কিছুটা চাঙ্গা করেছে।

কিন্তু কোরিয়ানরা নিজেদের জাত চিনাতে পারলো না প্রথম ম্যাচে। সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছে ৩-০ গোলে হেরে যায় এশিয়ার একমাত্র প্রতিনিধিরা। ব্রিটেনে রব উঠে “পিচ্চি খেলোয়াড়’রা কেনোই বা বিশ্বকাপ খেলতে এসেছে। অবশ্য কোরিয়ানদের দলের গড় উচ্চতাও ছিল ৫ ফুট ৫ ইঞ্চি। ১ম ম্যাচেই সবার কাছে তুচ্ছতা ছাড়া কিছুই পেলো না চল্লিমারা।(চল্লিমা ছিল তাদের দলের নিক নেম)

‘৬৬ বিশ্বকাপ টুর্নামেন্টে তাই সবচেয়ে কম দর্শক ছিল তাদের ২য় ম্যাচে চিলির সাথে। মাত্র ১৩৪৫ জন দর্শক যান এই ম্যাচ উপভোগ করতে। খেলা শুরু হতে হতেই আবারো গোল খেয়ে বসে উত্তর কেরিয়া। দর্শক ও ধীরে ধীরে কমতে থাকে ম্যাচ যত এগোয়। তবে, ৮৮ মিনিটে পাক-সিউং-জিনের গোলে পরাজয় থেকে রেহাই পায় কোরিয়ানরা।

সবচেয়ে আকর্ষণীয় এবং তাদের ফুটবল ইতিহাসের টার্নিং পয়েন্ট ছিল পরবর্তী ম্যাচ সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ইতালির বিপক্ষে। ম্যাচ শুরু হওয়ার ২ দিন আগেই আজ্জুরি প্রেসিডেন্ট গিসেপ সারাগাত ঘোষনা দেন কোরিয়াকে যাতে অগ্রিম ৩ গোল দিয়ে দেয়া হয়। ফিফা অবশ্য পরে নাকচ করে দেয় এই প্রোপোসাল। মিডলসবার্গে আয়রিসাম পার্কে ফগলি, লানদিনি, বুলগারেলির ইতালির বিপক্ষে মাঠে নামে হাজারো নাকালের শিকার উত্তর কোরিয়া। ৪২ মিনিটের মাথায় পাক-ডো-ইকের ডান পাশ থেকে জোরালো শটের গোলে লিড নেয় কোরিয়া। পুরো স্টেডিয়াম তৎক্ষনাৎ থমকে যায়। ব্রিটেন সহ পুরো ফুটবল বিশ্বই হয়তোবা কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। ২৪ বছর বয়সী পাকের গোলেই সমগ্র ফুটবল বিশ্ব দেখলো এক নতুন রুপকথার গল্প। ম্যাচটি শেষও হয় ওই ১-০ গোলেই। আজ্জুরিদের হারে যেন পুরো মিডলসবার্গ থমকে যায় এক সিনেমার গল্পের মতো জীবন্ত দৃশ্যে।

ইতালিয়ান গোলকিপার আলবার্তোসী জানান পুরো ক্যারিয়ারে তার জন্য লজ্জাজনক মুহূর্ত ছিল আয়রিসাম পার্কের সেই ট্রাজেডি। পুরো ব্রিটেন যেন এবার নতুন করে ভালোবাসতে শুরু করলো কোরিয়ানদের। বিবিসি এর সাংবাদিক ফ্রাংক বোগ জানান ইংলিশরা কখনো মিডলসবার্গে এত জয়োল্লাস করেনি। একমাত্র গোলদাতা পার্ক বলেন

আমি তখনই বুঝেছি ফুটবল শুধুমাত্র ম্যাচ জেতাই নয়। এটা তার চেয়েও বেশি কিছু। আবেগের শীর্ষস্থান।

সর্বত্র গ্রেট ব্রিটেনে তখন “খর্বকায় যোদ্ধাদের” জয় জয়কার। হবেই বা না কেন? ইতালিকে দেশের টিকেট তো তারাই ধরিয়ে দিয়েছে। অতি আত্মবিশ্বাসী ইতালিয়ান প্রেসিডেন্টের মুখে তো তারাই চুনকালি দিয়েছে। পরে অবশ্য ইতালি কোচ এডমান্ডো ফ্যাব্রিকে দেশে এনেই বহিস্কার করা হয়।

কোয়ার্টার ফাইনালে চলে যায় সাদা শিবির। পুরো ব্রিটেনও যেন এখন তাদের সাথে সর্বত্র বিরাজমান। ২৩ জুলাই, ১৯৬৬ সালে হাজার হাজার মানুষ ছুটে যায় লিভারপুল সিটিতে। কারণ কোরিয়ার কোয়ার্টারের ম্যাচটি তো হবে লিভারপুলের গুডিসন পার্কেই। ৫১,৭৮০ জন দর্শকের সামনে উত্তর কোরিয়া মাঠে নামে পর্তুগালের বিপক্ষে যারা ৩ দিন আগেই তৎকালীন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলকে বিদায় করে দেয়।

তাতে কিবা আসে যায় নতুনভাবে উজ্জীবিত এই এশিয়ান খর্বদের। ম্যাচ শুরু করলেন ডিনামাইট বিষ্ফোরকের মতো। মাত্র ২৪ মিনিটে ৩ গোল হজম করালেন বাপ্তিস্তা, লুকাস, তরেস, কলুনার পর্তুগালকে। পরে অবশ্য পর্তুগীজ গ্রেট ইউসেবিওর অতিমানবীয় পারফর্মেন্সে ৫-৩ গোলে হেরে স্বপ্ন ভঙ্গ হয় উত্তর কোরিয়ানদের। দ্য লিজেন্ড ইউসেবিও একাই করেন ৪ গোল।

তবে সবকিছু ছাপিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোড়ন তুলেছিল সেই উত্তর কোরিয়া-ইতালি ম্যাচটিই। পুরো ফুটবল বিশ্বকে থামিয়ে দিয়েছিল পাকের সেই ঠান্ডা মাথার নিঁখুত ফিনিশিং।

ইতালির বিপক্ষে সেই ম্যাচটিকে ঘিরে ২০০২ সালে ড্যানিয়েল গর্ডনের পরিচালনায় নির্মিত হয় ডকুমেন্টারি সিনেমা “দ্যা গেম অব দেয়ার লাইভস”। মাত্র ৮০ মিনিটের এই বিখ্যাত মুভিটি ২০০৩ সালে ৪ টি ক্যাটাগরিতে পুরস্কৃত হয়। ফুটবল বিশ্ব আরো বিস্তারিত ভাবে জানতে পারলো লি, ইয়াং, পাকের উত্তর কোরিয়ার সেই রূপকথার গল্প। পুরো মুভিটিই ছিল এক খর্বকায় জাতির খর্বকায় দলের ইতিহাস রচনার কাব্য। এশিয়ান এই যোদ্ধারা ব্রিটিশ মাটিতে প্রমাণ করে দিয়ে এসেছেন “ফুটবল ইজ মোর দ্যান এ গেম!”

আরো পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *