Saturday, 21 Apr 2018

লাতিনদের সেরা ৭ গোলদাতা

লাতিনরা ফুটবল নিয়ে মেতে থাকাকে সবচেয়ে বেশী পছন্দ করে। অন্যন্য মহাদেশে দিন কেমন শুরু হয় তা জানা নেই, কিন্তু লাতিন আমেরিকায় সূর্য উদয় হওয়ার সাথে সাথে ফুটবল নিয়ে ছেলেরা মাঠের দিকে অগ্রসর হয়। তাদের এখানে ফুটবলকে স্বর্গীয় দেবতা হিসেবেই মানে। ফুটবল তাদের ধর্ম।

রোনালদিনহোকে একবার ব্রাজিলের সেরা খেলা কোনটি বলে প্রশ্ন করলে, রোনালদিনহো শান্তশিষ্টভাবে উত্তর দিলেন বাস্কেটবল (সম্ভবত)। উত্তরে অনেকেই চমকে যান, তারপর আবার জিজ্ঞেস করা হয় “তাহলে ফুটবল?” রোনালদিনহোর উত্তর আরো চমকপ্রদ ছিল।

উত্তর ছিল ব্রাজিলিয়ানদের কাছে ফুটবল হল ধর্ম। ধর্ম মানেন বলেই ব্রাজিলে আজ এত এত লিজেন্ড। শুধু ব্রাজিল না উরুগুয়ে আর আর্জেন্টিনাতেও ফুটবলকে সবকিছুর উপরে রাখা হয়। লাতিন আমেরিকার ঐতিহ্য ধরে রাখতে তিনদলই একসাথে এগিয়ে আসে।

লাতিন আমেরিকার এত এত লিজেন্ডদের ভিড়ে খুব কম খেলোয়াড় ৫০ গোলের মাইলফলক স্পর্শ করতে পেরেছেন। সংখ্যায় মাত্র ৭ জন এই মাইলফলক স্পর্শ করেন। এর মধ্যে ব্রাজিলিয়ান ৪জন, আর্জেন্টাইন ২জন, এবং উরুগুয়ের ১জন খেলোয়াড়ের নাম আছে। এরা সেরা কি না সেই বিচারে যাব না! যেহেতু বিষয়টা গোলের, সেহেতু এখানের ৭জন অন্যান্যদের চেয়ে অন্তত গোলের দিক দিয়ে সেরা। সেই ৭জনের নাম এবং তারা কোন দেশের তা জেনে আসিঃ

পেলে ৯১ ম্যাচ ৭৭ গোল


পেলে

সর্বকালের সেরা এই খেলোয়ার কি ছিলেন তা আমি বলা শুরু করলে শেষ করতে পারব না। তাকে বর্ণনা করার মত কেউ আছেন কি না আমার জানা নেই। ফুটবল যখন মাথায় আসবে পেলে নামটা মনের চক্ষুতে স্পষ্টভাবে ভেসে উঠবে। নিজের ক্যারিয়ারের গোলসংখ্যা কিঞ্চিৎ হলেও তার শ্রেষ্ঠত্বকে প্রমাণ করে।

জাতীয় দলের হয়ে মাত্র ৯১ ম্যাচে ৭৭ গোল করেন কালো মানিক খ্যাত ফুটবলের প্রাণ পেলে। তার করা ৭৭গোলের বেশিরভাগ গোল ছিল গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে। ইতিহাস সেরা খেলোয়ার পেলে নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন ব্রাজিল হয়ে তিনটি বিশ্বকাপ জিতে।

তার ৭৭ গোলের ১২টি ছিল ফুটবলের বড় আসরে। ব্রাজিলের কার্লোস নামক এক কবি বলেছিলেন “পেলের মত গোলসংখ্যা বাড়ানো বড় কথা নয়, বড় কথা হল তার ন্যায় একটা গোল করা”। ইতালির এক ডিফেন্ডার (বার্গানিচ) “আমি ফাইনালের আগে তাকে আমাদের মত মানুষ ভেবেছিলাম, আর এটাই ছিল আমার ভুল, ফাইনালের পর আমার ধারণা পালটে যায়” (ইতালি ও ব্রাজিলের মধ্যকার ফাইনাল সম্পর্কে)

রোনালদো ৯৮ ম্যাচ ৬২গোল


রোনালদো

রোনালদো দ্যা লিমা তার ফিনিশিং শক্তির কারণে ফেনোমেনন উপাধিতে ভূষিত হন। অনেক তর্ক বিতর্ক হয় সে সর্বকালের সেরা নাম্বার নাইন কি না! কিন্তু দিনশেষে সবাই তাকে সর্বকালের সেরা স্ট্রাইকার হিসেবেই গ্রহন করে। ক্যারিয়ারে ব্রাজিলের হয়ে ৯৮ ম্যাচে ৬২ গোল করা রোনালদো বিশ্বকাপ আসরে সর্বপ্রথম ১৫ গোলের মাইলফলক স্পর্শ করেন।

৮ বছর বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ আসরের গোলদাতার রেকর্ডটি ধরে রেখেছিলেন। কিন্তু সর্বশেষ ১৪ বিশ্বকাপে ক্লোসা রেকর্ডটি তার অধীনে নিয়ে নেন। কিন্তু তারপরও রোনালদো লিমাকে সর্বকালের সেরা স্ট্রাইকার হিসেবে গন্য করা হয়। সে শুধু গোল স্কোরার ছিল না, একসাথে নাম্বার নাইন এবং নাম্বার টেনের রোল প্লে করার ক্ষমতা ছিল লিমার। ক্ষিপ্রগতি আর অসাধারণ ফিনিশিংয়ে ফ্যনদের মনে জায়গা করে নিয়েছেন আজীবনের জন্য।

তার সতীর্থ এমারসন তাকে ব্যখ্যা করতে বলেন, “আমি পেলেকে দেখিনি, রোনালদোকে দেখেছি “

তারপর ইব্রার একটা উক্তি আপনাকে মনে করিয়ে দিতেই হয়। ইব্রাহিমোভিচ রোনালদো সম্পর্ক বলেন “সেরা প্রতিপক্ষ কে? আমার দেখা রোনালদো, সর্বকালের সেরা কে? আমার দেখা রোনালদো “

আমার কোনো সন্দেহ নেই রোনালদো সর্বকালের সেরা স্ট্রাইকার। সর্বকালের সেরা না হলেও, তাদের মধ্যে অন্যতম।

লিওনেল মেসি ১২১ ম্যাচ ৬১ গোল


লিওনেল মেসি

সমালোচনার ঝড় তার দিকে কম যায়নি, কারণ হিসেবে অনেকেই উল্লেখ করত মেসি জাতীয় দলের প্রতি ডেডিকেটেড না। জাতীয় দলের হয়ে মেসি ক্লাবের ন্যায় পারফরমেন্স দিতে পারেন না। কিন্তু তারপরও মেসি আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়ে সর্বোচ্চ গোলদাতার সাথে লাতিন আমেরিকার ৩য় সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনটি দখল করে নেন। রোনালদো ফেনোমেননের ঘাড়ে শ্বাস ফেলছেন মেসি আর মাত্র একটি গোল করলেই ছুয়ে ফেলবেন তাকে, ২টি গোল করতে পারলে হয়ে যাবেন লাতিন আমেরিকার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা। আর ১৫ গোল করতে পারলে লাতিন আমেরিকার সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়ে যাবেন। মেসির সম্পর্কে বর্ণনা করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। গার্দিওলার একটা উক্তি শুনাই, তিনি বলেন, “তাকে বর্ণনা করতে যেও না, শুধু দেখ এবং উপভোগ কর”। এরকম অনেক উক্তি আছে, অনেক মহারথী তাকে নিয়ে সম্মানীয় উক্তি করেন। জাতীয় দলের ক্যারিয়ারে ১২১ ম্যাচে ৬১ গোল করেন মেসি, তার শেষ তিনটি গোল ছিল দলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সেই তিন গোলের কারণেই আর্জেন্টিনা ১৮’বিশ্বকাপ খেলতে পারবে।

গাব্রিয়েল বাতিস্তুতা ৭৮ ম্যাচে ৫৪ গোল


গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা

আর্জেন্টিনার সেরা স্ট্রাইকার কে? বাতিস্তুতা, অনায়াসে এই নাম সবার মুখে চলে আসবে। কোন সন্দেহ কারোর থাকার কথা না, কারণ জাতীয় দলের হয়ে এই লিজেন্ড করেছেন ৫৪ গোল, ম্যাচ খেলেছেন মাত্র ৭৮টি! আর্জেন্টিনার হয়ে সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ডটি প্রায় এক যুগের বেশী তার অধীনে ছিল। সর্বশেষ ২০১৬তে মেসি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে গোল করে বাতিস্তুতার রেকর্ড টপকে যান।

বাতিস্তুতা তার সময়ের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকারও ছিলেন। বিশ্বকাপে রেকর্ড ২টি হ্যাট্রিকের সাথে গোল করেন ১০টি, তবে আর্জেন্টিনার হয়ে বিশ্বকাপ তার অধরাই রয়ে যায়।

বাতিস্তুতা বিখ্যাত ছিলেন ডি বক্সে তার পজিশনের জন্য, নিখাদ ফিনিশিং, অসাধারণ হেড, ডি বক্সের যেকোনো এঙ্গেল থেকে গোল করার ক্ষমতা ছিল বাতিস্তুতার। তার এসব গুনের জন্য তার নাম দেয়া হয় বাতিগোল।

রোমারিও ৭০ ম্যাচ ৫৫ গোল


রোমারিও
রোমারিও

১৯৯৪ বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড় ছিলেন রোমারিও, ব্রাজিলিয়ান এই কিংবদন্তী ব্রাজিলের হয়ে ৫৫ গোল করেন ৭০ ম্যাচ খেলে, যা সত্যি প্রশংসনীয়।

১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপে ব্রাজিলকে চ্যাম্পিয়ন করানোর অন্যতম সেরা নায়ক ছিলেন ডি বক্সের রাজা রোমারিও। অসাধারণ ফর্ম ধরে রাখতে পারলেও বয়স এবং উশৃংখলতার  দোহাই দিয়ে কোচ লুই স্কলারি তাকে ২০০২ বিশ্বকাপে রাখেননি। যদিও বয়সটা বেশীই ছিল, সংখ্যায় ৩৬! কিন্তু কোচের এই ডিসিশন ভুল হতে পারত, সমালোচনায় মুখরিত হতে পারতেন, ব্রাজিল চ্যাম্পিয়ন হওয়ায় কোচ স্কলারি রক্ষা পেয়ে যান।

নেইমার ৭৭ ম্যাচে ৫৩ গোল


নেইমার
নেইমার

নেইমার জুনিয়র মাত্র ৭৭ ম্যাচে ৫৩ গোল করেন। বয়স মাত্র ২৬! আর এখনই রীতিমত বিশ্বকে চমকে দিচ্ছেন। ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তী পেলেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার আশংকা তৈরি করছেন নেইমার, অনন্য খেতাবে না পারলেও গোল সংখ্যায় ছাড়িয়ে যাওয়ার যথেষ্ঠ সুযোগ রয়েছে নেইমার জুনিয়রের।

লাতিন আমেরিকার সবচেয়ে কম বয়সে ৫০ গোল করার মাইলফলক সম্ভবত নেইমারের অধীনে। এই ব্রাজিলিয়ান বর্তমানে ব্রাজিলের সেরা প্লেয়ার, ব্রাজিল সমর্থকদের প্রত্যাশার পাহাড়টাও তার কাধে। হবে না কেন? রোনালদিনহোর রঙ যার মধ্যে পাওয়া যায়, তার উপর প্রত্যাশাও বেশী থাকবে স্বাভাবিক!

 সুয়ারেজ ৯৯ ম্যাচে ৫০গোল


লুইস সুয়ারেজ
লুইস সুয়ারেজ

লাতিন আমেরিকার সপ্তম এবং শেষ প্লেয়ার হিসেবে ৫০ গোলের এলিট গ্রুপে সামিল হন সুয়ারেজ। বর্তমান সেরা স্ট্রাইক সুয়ারেজকে উরুগুয়ের ইতিহাসের অন্যতম সেরা ধরা হয়ে তাই উরুগুয়াইনদের প্রত্যাশার ভারটা তার উপরই।

গত বিশ্বকাপেও উরুগুয়েকে দ্বিতীয় রাউন্ডে তুলতে যথাসাধ্য চেষ্টা করেন সুয়ারেজ, সফলও হন। কিন্তু ইতালীর সাথে গ্রুপ পর্বে বাচ্চা সুলভ বিতর্কিত কর্মকান্ডে বিশ্বকাপ থেকে বহিষ্কৃত হন সুয়ারেজ। এরপর উরুগুয়ে কলম্বিয়ার সাথে হেরে বাদ পরে যায় দ্বিতীয় রাউন্ড থেকে আর এর থেকে কিঞ্চিত পরিমাণ হলেও বুঝা গেল উরুগুয়ে অনেকটাই সুয়ারেজ নির্ভর।

উরুগুয়াইন এই লিজেন্ড ৯৯ ম্যাচে করেন ৫০ গোল। এখনো খেলে যাচ্ছেন। গত চারদিন পূর্বেই লুইস সুয়ারেজ ৫০ গোলের মাইলফলক স্পর্শ করেন।

লাতিন আমেরিকার ৭জন ৫০ গোলের অতিক্রম করেন এরমধ্যে তিনজন এখনো খেলে যাচ্ছে। তারা হলেন মেসি-সুয়ারেজ-নেইমার।

মজার বিষয় হল এই তিনজন আবার একসাথে খেলেছেন কাতালান ক্লাব বার্সার হয়ে। তাদের সম্মিলিত গোল সংখ্যাও ছিল ৩০০+। বিশ্বকাপ না জিতলেও কোপা আমেরিকা জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করেন সুয়ারেজ। আর্জেন্টিনার যেমন মেসি, ব্রাজিলের যেমন নেইমার তেমনি উরুগুয়ের আছেন সুয়ারেজ।

আরো পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *